সোমবার
২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিটি নির্বাচনে তরুণ প্রার্থী দিয়ে চমক দেখাতে চায় জামায়াত

মো. ইলিয়াস
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম
এনপিবি কোলাজ।
expand
এনপিবি কোলাজ।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি এবার বিভিন্ন সিটিতে তরুণ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এবং সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের প্রার্থী করে ভোটারদের কাছে নতুন বার্তা দিতে চায়। দলীয় সূত্র বলছে, সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে রাজনৈতিক চমক দেখানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জামায়াত। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নতুন মুখ ও তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা জামায়াতের জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে ২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে প্রার্থী করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, দেশের বড় একটি অংশ এখন তরুণ ভোটার। তাদের প্রত্যাশা ও নগরবাসীর বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সামনে আনলে নির্বাচনে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিকে নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

জানা গেছে, সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের একটি তালিকা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয়, পেশাগতভাবে পরিচিত এবং জনসম্পৃক্ত নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ক্যাম্পেইন এবং নগর সমস্যাকেন্দ্রিক নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজও চলছে।

প্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই বিদেশে শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন পেশায় থাকলেও ইতোমধ্যে তাদের দেশে ফিরে আসতে নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। এরই ধারবাহিকতায় গাজীপুরে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার জন্য ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুকে দেশে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের মধ্যে ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু ফিলিপাইনের একটি ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন এবং ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান তুরস্কের তুকাত গাজী উসমান পাশা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে গত জুন মাসে ৯টিতে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত মেয়র প্রার্থী হলেন মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, গাজীপুরে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান ও সিলেট সিটি করপোরেশনে ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপুকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছেন।

এছাড়াও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী, বরিশালে দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে মহানগর শাখার আমির এ টি এম আজম খান, খুলনায় কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে প্রাথমিকভাবে চুড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া ময়নসিংহ সিটিতেও জামাতের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, এসব সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক, জনকল্যাণমূলক ও গণসংযোগমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন। তারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলের মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরছেন। এছাড়া মাদক বিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছেন সেলিম উদ্দিন।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে বিদায় নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, গত বুধবার তিনি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীতে যোগদানও করেছেন।

এর আগে ২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে সাদিক কায়েম দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনায় আসেন। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হন এবং বর্তমানেও এই দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং পরবর্তীতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়া গাজীপুর সিটির মেয়র প্রার্থী ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগরী উত্তরের সাবেক সেক্রেটারি এবং তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা (টঙ্গী শাখা) ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন।

এছাড়াও সিলেট সিটি করপোরেশেনের মেয়র প্রার্থী ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিনি সংগঠনটির সিলেট মহানগর শাখার সাবেক সভাপতি ছিলেন।

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের ২০১৪ সেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর আগে তিনি সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। এসব সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, দেশের ৩৩১টি পৌরসভা, অধিকাংশ উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদেও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ প্রায় শেষ করেছে দলটি।

দলীয় সূত্র মতে, বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতারা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সাবেক শিবির নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ সালাউদ্দিন আইয়ুবী। এছাড়াও শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদও ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেরপুর-১ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

শিবিরের আরেক সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মাসুদও জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন।

এমনকি শেখ মনজুরুল হক রাহাদ নামের আরেক সাবেক শিবির নেতাও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে মনোনীত হয়ে বাগেরহাট-২ (সদর ও কচুয়া) আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। তিনি একজন তরুণ ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। এর সূত্র ধরে সিটি নির্বাচনে তরুণদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এনপিবি নিউজকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পরপরই দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা ও মহানগর ইতোমধ্যে প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতারা প্রার্থীদের প্রস্তাবনা দিয়েছেন। ৯টি সিটি করপোরেশনে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা ও বগুড়া সিটি করপোরেশন প্রস্তাবনা হাতে আসলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে। বাকিগুলো স্থানীয় ভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে, তারা তাদের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অধিকাংশ প্রার্থী তরুণ। আর এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে জানান জামায়াতের এই নেতা।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এনপিবি নিউজকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত জামায়াতের প্রস্তুতি ঠিক থাকলেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসক পদে যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদেরকে সরাতে হবে। এই পদে থেকে তারা প্রার্থী হতে পারবে না, পদত্যাগ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানিপুলেশনের মতো যেসকল অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর বিষয়ে সরকার নিরপেক্ষ হলে আশা করি নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে এবং আমরা অংশ নেব ইনশাআল্লাহ। অলমোস্ট (প্রায়) সব প্রার্থীরা তরুণ হবে বলেও জানান গোলাম পরওয়ার।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন