মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসেও ফ্যাসিবাদের থাবা: জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের দায়

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৩ পিএম
expand

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় জলবিভাজিকা। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের ছাত্র-জনতা এক নতুন, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশের সূচনা করেছে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর, রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে একটি উন্নততর ‘ইন্টিগ্রেশন সোসাইটি’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। যখন দেশের সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন অসীম উদারতা ও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টির মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পরিবার-পরিজনকে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন নিশ্চিত করছে, তখন এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বিপরীতমুখী চিত্র দেখা যাচ্ছে বিদেশের মাটিতে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ-বিশেষ করে সম্প্রতি ইতালির ভেনিসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির বীর যোদ্ধা ও প্রবাসে আন্দোলনকারীদের ওপর ফ্যাসিবাদের দোসরদের কাপুরুষোচিত ও সুপরিকল্পিত হামলা আমাদের চরমভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকারের একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, এই বৈশ্বিক সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও অপরাধতাত্ত্বিক অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে।

প্রবাসে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর হামলার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট

বিগত জুলাই বিপ্লবের সময় থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। রেমিট্যান্স শাটডাউন থেকে শুরু করে বহির্বিশ্বের রাজপথে প্রতিবাদের মাধ্যমে তারা শেখ হাসিনা সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পরও প্রবাসে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর উগ্র ক্যাডাররা তাদের চিরচেনা হিংস্র আচরণ পরিহার করতে পারেনি। সম্প্রতি ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে যাওয়া জুলাই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রবর্তী কণ্ঠস্বর, বিশিষ্ট অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন ও তাঁর পরিবারের ওপর নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রবাসী কর্মীরা যে ন্যক্কারজনক ও শারীরিক আক্রমণ চালিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। হামলাকারীরা কেবল গায়ে হাতই তোলেনি, বরং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় জুলাই যোদ্ধাদের ‘জঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করেছে, যা তাদের চরম মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে সাধারণ প্রবাসী জুলাই যোদ্ধাদের টার্গেট করে ক্রমাগত হুমকি ও অতর্কিত হামলা চালানো হচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী আমাদের মুক্তিকামী বীরদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: অপরাধবিজ্ঞান ও মনস্তাত্ত্বিক অবদমন

অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই হামলাগুলোকে ‘রিসেন্টমেন্ট-ড্রিভেন পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স’ (Resentment-driven Political Violence) বা ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা-তাড়িত রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। যখন একটি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে ভোগ করা একচ্ছত্র ক্ষমতার বলয় থেকে আকস্মিকভাবে বিচ্যুত হয়, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘কালেক্টিভ ট্রমা’ বা সম্মিলিত মানসিক বিপর্যয় তৈরি হয়। এই বিপর্যয় থেকে উৎপন্ন ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে অবদমন করতে না পেরে প্রবাসের মুক্ত পরিবেশে সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ করছে।

মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এটি ‘ট্রান্সनेशनल রিপ্রেশন’ (Transnational Repression) বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিপীড়নের একটি নিকৃষ্ট রূপ। দেশে আইনি ব্যবস্থার ভয়ে পলাতক বা প্রবাসে সুপ্রতিষ্ঠিত স্বৈরাচারের দোসররা আন্তর্জাতিক আইন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের অপব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বী এবং জুলাই বিপ্লবের নায়কদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও জনগণ দেশের অভ্যন্তরে পরম সহনশীলতা প্রদর্শন করে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে, সেখানে প্রবাসে তাদের এই আচরণ ‘অপ্রতিসম অপরাধ প্রবণতা’ (Asymmetric Criminal Behavior)-র জন্ম দিচ্ছে। অর্থাৎ, উদারতার বিপরীতে তারা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে।

জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের প্রতি সনির্বন্ধ আহ্বান

জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের কাছে আজ দেশবাসীর অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন এবং প্রত্যাশা রয়েছে। দেশের মানুষ জানতে চায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের গৌরবময় জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা রক্ষায় এবং এই ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসীদের দমনে সরকারের ভূমিকা ও কূটনৈতিক তৎপরতা কতটুকু দৃশ্যমান?

একজন সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে, রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি:

১. কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয়করণ ও বহিস্কারের দাবি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সাথে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে হবে। ভেনিসসহ বিভিন্ন স্থানে হামলায় জড়িত চিহ্নিত অপরাধীদের পাসপোর্ট ও ভিসা বাতিল করে তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট (বহিষ্কার) করার জন্য আইনি ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

২. দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা

জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় পরিচালিত প্রতিটি বাংলাদেশ দূতাবাসকে প্রবাসে অবস্থানরত জুলাই যোদ্ধা, বিপ্লবী কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহারাদার হিসেবে কাজ করতে হবে। দূতাবাসে একটি বিশেষ ‘সেল’ গঠন করা যেতে পারে, যা প্রবাসে ফ্যাসিবাদী তৎপরতার ওপর নজরদারি রাখবে।

৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার

প্রবাসে বসে যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নাগরিক ও জুলাই বিপ্লবের বীরদের ওপর আক্রমণ করছে, তাদের তালিকা তৈরি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

৪. ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ নজরদারি

দেশের অভ্যন্তরে যেসকল ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর পরিবার পরিজন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে নিরাপদে আছেন, তাদের পরিবারের প্রবাসে থাকা সদস্যরা যদি দেশের বিরুদ্ধে ও দেশের বীরদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে, তবে দেশের অভ্যন্তরেও তাদের ওপর সুনির্দিষ্ট আইনি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।

শহীদদের রক্ত ও বীর যোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের মব কালচার বা সন্ত্রাসী আস্ফালন বরদাশত করা হবে না- তা দেশের ভেতরেই হোক কিংবা প্রবাসে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি'র নেতৃত্বে যে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, বহির্বিশ্বে ফ্যাসিবাদের দোসরদের লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাসীরা তা কোনোভাবেই নস্যাৎ করতে পারবে না। সরকারের উচিত এখনই অত্যন্ত কঠোর ও দূরদর্শী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রবাসে জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করা যে, অপরাধী যেখানেই থাকুক না কেন, ন্যায়বিচারের হাত থেকে তার নিষ্কৃতি নেই। জনগণের সরকার জনগণের এই প্রত্যাশা পূরণে কালবিলম্ব না করে তাদের গৃহীত ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপসমূহ দেশবাসীর সামনে পরিষ্কার করবে, এটাই আমাদের একান্ত কাম্য।

লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank