রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনৈতিক অর্থনীতিঃ বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বনাম রাজনৈতিক দৃঢ়তা

ড. আসিফ মিজান
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
ছবি: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
expand
ছবি: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন এবং কাঠামোগত রূপান্তর বহুলাংশে নির্ভর করে তার নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ার গতিশীলতা এবং তা বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুপদী তাত্ত্বিক কাঠামোতে ‘আমলাতন্ত্র’ এবং ‘আরোপিত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব’ কে রাষ্ট্রের দুটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি নীতি প্রণয়ন করে, অন্যটি তা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই দুই শক্তির মধ্যকার ভারসাম্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একটি অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা, নাগরিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আজ এই সম্পর্কের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পুনর্মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পুরো সংকট, সম্পর্ক এবং সমাধানকে আমরা অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক তত্ত্ব—‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব’ -এর আলোকে বিশ্লেষণ করতে পারি। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো: একজন মালিক বা প্রধান ব্যক্তি যখন নিজের কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য কোনো প্রতিনিধি বা এজেন্টকে দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেন, তখন তাদের মধ্যে একটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এজেন্ট অনেক সময় মালিকের স্বার্থরক্ষা না করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থায় এক বড় সংকটের জন্ম দেয়।

ম্যাক্স ওয়েবারের আদর্শ আমলাতান্ত্রিক মডেলে আমলারা হবেন পেশাদার, নিরপেক্ষ, নৈর্ব্যক্তিক এবং কঠোরভাবে নিয়মতান্ত্রিক। অর্থাৎ, তারা হবেন 'প্রিন্সিপাল' বা জনগণের প্রকৃত বাধ্য 'এজেন্ট'। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার সমান্তরালে আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার যে বিস্তার ঘটেছে, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হামজা আলাভীর ‘অতি-উন্নত রাষ্ট্রকাঠামো’ তত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, ঔপনিবেশিক শক্তির রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামো রাজনৈতিক ব্যবস্থার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় 'এজেন্ট মোরাল হ্যাজার্ড' বা প্রতিনিধির নৈতিক স্খলন—যেখানে তথ্য ও ক্ষমতার দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কারণে আমলারা (এজেন্ট) আসল মালিকদের (জনগণ ও রাজনীতিবিদ) তোয়াক্কা না করে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন—সর্বত্র এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আধিপত্য এখন দৃশ্যমান। যখন কোনো রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে অ-নির্বাচিত আমলাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সেখানে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা সংকুচিত হতে বাধ্য। বর্তমান রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এই আমলাতান্ত্রিক অতি-নিশ্চয়তা জনকল্যাণের চেয়ে জোসেফ স্টিগলিটজের বর্ণিত ‘নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীর ক্যাপচার’ তত্ত্বের রূপ নিয়েছে; যেখানে ক্ষমতার মূল মালিকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এজেন্টরা নিজেরাই পুরো রাষ্ট্রীয় নীতিকে নিজেদের স্বার্থে কুক্ষিগত করে ফেলেছে।

এর বিপরীতে প্রয়োজন এক বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী 'রাজনৈতিক দৃঢ়তা'। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্টনিও গ্রামসির ‘হেজেমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারণা থেকে ধার করে বলা যায়, বা রাজনৈতিক দৃঢ়তা বলতে কেবল ক্ষমতার আস্ফালন নয়, বরং জনম্যান্ডেট বা জনগণের রায়কে ধারণ করে আমলাতন্ত্রের ওপর জনগণের প্রতিনিধিদের আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট মডেলের প্রধান শর্তই হলো, এজেন্ট যাতে মালিকের ওপর ছড়ি ঘোরাতে না পারে, সেজন্য মালিকের হাতকে শক্তিশালী বা 'দৃঢ়' হতে হবে। নীতি নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি থাকতে হবে রাজনীতিবিদদের হাতে, যারা প্রতি পাঁচ বছর পর পর জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। ডেভিড ইস্টনের ‘সিস্টেমস অ্যানালিসিস’ অনুযায়ী, রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ও নীতি প্রদান করতে না পারে, তবে ব্যবস্থার স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়ে। যখন রাজনীতি তার নিজস্ব নীতি, আদর্শ এবং গণমুখী চরিত্র হারিয়ে আমলাতন্ত্রের (এজেন্ট) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন একে বলা হয় 'এজেন্ট ডমিন্যান্স' বা প্রতিনিধির কর্তৃত্ববাদ। এর ফলে রাষ্ট্রের নীতিকাঠামোতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীতন্ত্রের জন্ম হয়, যা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের ‘সীমিত প্রবেশাধিকার আদেশ’-এর মতো একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতাকে বিনষ্ট করে গুটিকয়েক মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত করে।

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের বর্তমান আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—তারা একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্ব অনুযায়ী, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান তখনই সম্ভব যখন প্রিন্সিপাল (জনগণ ও তাদের প্রতিনিধি) এবং এজেন্টের (আমলাতন্ত্র) মধ্যকার 'তথ্যের অসমতা' দূর করা যাবে—অর্থাৎ আমলারা কী করছেন না করছেন, তা যেন জনগণের কাছে সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকে। এই জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে আমলাতন্ত্র বনাম রাজনৈতিক দৃঢ়তার এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের একটি টেকসই ও বাস্তববাদী সমাধান খোঁজা অপরিহার্য। এই সংকট উত্তরণে নিম্নোক্ত কৌশলগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুনরুত্থাপন ও নীতি-ভারসাম্যঃ

নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় আমলাদের ওপর জনপ্রতিনিধি ও সংসদীয় কমিটিগুলোর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় আমলারা হবেন কেবল নীতিনির্ধারকদের পরামর্শদাতা ও বাস্তবায়নকারী (এজেন্ট), নীতিনির্ধারক (প্রিন্সিপাল) নন।

২. নিউ পাবলিক ম্যানেজমেন্ট মডেলের অনুকরণে সংস্কারঃ

ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা পরিহার করে আমলাতন্ত্রকে জনবান্ধব ও সেবামূলক সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে। প্রিন্সিপাল-এজেন্ট তত্ত্বে বর্ণিত 'পারফরম্যান্স-বেসড ইনসেনটিভ' বা কাজের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার ও শাস্তির নিয়ম চালু করতে হবে। মেধা, সততা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা আবশ্যক, যেখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে পেশাদারিত্ব প্রাধান্য পাবে।

৩. স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধিঃ

তথ্য অধিকার আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও বেগবান করতে হবে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে এবং মূল প্রিন্সিপাল বা নাগরিক সমাজ প্রশাসনের ওপর নিখুঁত ও সঠিক নজরদারি বজায় রাখতে পারবে, যা এজেন্টের স্বেচ্ছাচারিতা ঠেকানোর সর্বোত্তম উপায়।

৪. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও তৃণমূল ক্ষমতায়নঃ

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করা প্রয়োজন। প্রিন্সিপাল যদি এজেন্টের খুব কাছাকাছি থাকে, তবে নজরদারি সহজ হয়। তৃণমূলের উন্নয়ন বাজেট ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত থাকলে আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।

অতএব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক ও তাত্ত্বিক দৃঢ়তার সুষম সমন্বয়ের ওপর। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের বিশ্লেষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; তিনি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের যে ভারসাম্যহীনতার চিত্র তুলে ধরেছেন, তা মূলত এই প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সম্পর্কেরই এক বাস্তব রূপ। একই সাথে বরেণ্য অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের অর্থনৈতিক সুশাসন ও নীতি কাঠামোর গণতান্ত্রিকীকরণের দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহিতা ছাড়া সুষম অর্থনৈতিক বণ্টন ও সুশাসন অসম্ভব। আমলাতন্ত্রকে অবশ্যই তার পেশাগত সীমানার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের ‘এজেন্ট’ বা সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ‘প্রিন্সিপাল’ বা গণমানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে অটল সাহসিকতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনায় চালকের ভূমিকা নিতে হবে। তবেই একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব, যা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাবে।

লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন