


তীব্র গ্যাস-সংকটে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানার উৎপাদন ইতোমধ্যেই ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে একদিকে যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বাড়ছে জুলাই-আগস্ট মাসেই প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষয়ক্ষতি আশঙ্কা।
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বিসিক, সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড, সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার এলাকার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোতে গ্যাস–সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে। তাঁদের হিসাবে, জেলায় প্রায় ১ হাজার ৮৩৪টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে যেতে পারছে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সালের করোনা মহামারিতে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ছোট-বড় অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে জেলার অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সরকার উদ্যোগ নিলেও বন্ধ হওয়া অধিকাংশ কারখানা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। এবার গ্যাস–সংকটের কারণে চালু থাকা কারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্রাইম গ্রুপ অব কোম্পানিজের একটি নিট কারখানা ও একটি ডাইং কারখানা ছিল। গ্যাস–সংকটের কারণে ডাইং কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই কারখানায় প্রায় ২৫০ শ্রমিক কাজ করতেন। তাদের ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন বিভাগে কাজে দেওয়া হয়েছে। এখন বাইরে থেকে কাজ করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
কোম্পানিটির চেয়ারম্যান আবু জাফর আহমেদ বাবুল বলেন, গ্যাসের সমস্যার কারণে তার ওয়াশিং প্ল্যান্টে বর্তমানে উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করছেন তিনি। কখনো ডায়ার বন্ধ রেখে বয়লার চালাতে হচ্ছে, আবার কখনো বয়লার চালিয়ে ডায়ার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এভাবে ২৪ ঘণ্টা কারখানা চালিয়েও উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
আবু জাফর আহমেদ বাবুল বলেন, গ্যাসের চাপ ৫০ পিএসআইয়ের নিচে হলেই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এতে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ‘স্টক লট’ হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ক্রেতারা যদি পণ্য সরবরাহের সময় কিছুটা বাড়িয়ে দেন, তাহলে সমুদ্রপথে পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে বর্তমানে অনেক কারখানায় দৈনিক গড়ে চার ঘণ্টাও উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মাঝপথে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদিত কাপড়ের মান নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালাতে হয়। কিন্তু সব কারখানার পক্ষে এ ধরনের বাড়তি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।
নাসির উদ্দিন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে এখন কারখানা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে যাবে। এমনকি আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ১৩২টি ডাইং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) কর্মকর্তারা জানান, বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ (পিএসআই) থাকছে ১, শূন্য দশমিক ৫, আবার কখনো কখনো শূন্যে নেমে যাচ্ছে। গ্যাস–সংকটের কারণে সঠিক সময়ে শিপমেন্ট দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আপনার গ্যাস নেই, আপনার ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এটা দিবালোকের মতো সত্য।’ তাঁর ভাষায়, ‘১ পিএসআই দিয়ে তো ফ্যাক্টরি চলে না।’
বিকেএমইএর সদস্যদের অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তিতাস গ্যাস দিতে পারছে না। সরবরাহ করা গ্যাস না থাকায় অন্তত বেঁচে থাকার জন্য সামান্য পরিমাণে গ্যাস নিয়ে ফিনিশিং সেকশন চালানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। কিন্তু সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোকে চিঠি দিয়ে সিলিন্ডারে গ্যাস না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘সেটাও যদি আপনারা চিঠি দিয়ে নিষেধ করে দেন, বন্ধ করে দেন, এটা তো মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।’
গ্যাস–সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে একটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। পুলিশ লাইনের পাশে সাইন নেটওয়ার্ক, আরবিও এবং প্যারাগন বন্ধ হয়েছে। এভাবে কয়েকটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। প্রতিনিয়তই কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এসব কারখানার শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে যে এফএসআরইউ রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করে সরবরাহ লাইনে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই ব্যবস্থা ভাসমান না রেখে স্থলভাগে সরবরাহ কেন্দ্র করার জন্য সরকারকে বলা হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি হিসেবে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর আওতায় নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার কারখানা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১ হাজার কারখানা গ্যাস–সংকটের মধ্যে আছে বলে দাবি সংগঠনের নেতাদের। এতে জুলাই ও আগস্ট মিলিয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হবে বলে তাদের আশঙ্কা।
তবে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মনজুর আজিজ মোহনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, তাঁদের এলাকার আওতাভুক্ত ৩৯৬টি কারখানায় কোনো গ্যাস–সংকট দেখা দেয়নি। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী তাদের কাছে গ্যাস–সংকটের অভিযোগও করেননি। তবে কিছু কিছু এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাস–সংকট রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।