

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাঙালি জাতির ইতিহাসে জাহানারা ইমাম এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন লাখো মুক্তিযোদ্ধার পরম শ্রদ্ধেয় মা- 'শহীদজননী'। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
জন্ম, পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষাজীবন
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুরে জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল 'জুড়ূ'। পিতা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং মাতা সৈয়দা হামিদা বেগম। পিতার চাকুরিসূত্রে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর পড়াশোনার সুযোগ ঘটে।
জাহানারা ইমাম কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ পাস করেন। বি.এড ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বাংলায় এম.এ পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
কর্মজীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড
জাহানারা ইমামের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল শিক্ষাকতার মধ্য দিয়ে।
ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনের সূচনা করেছিলেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। পরে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে(১৯৬৮ সালে এই চাকরি ছেড়ে দেন)।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও তিনি কিছুদিন খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।
চাকরি ছাড়ার পর তিনি ঢাকার সাংস্কৃতিক মহলে একজন ব্যক্তিত্বময়ী নারী হিসেবে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন এবং নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেন।
একাত্তরের দিনগুলি ও সাহিত্য সাধনা
ষাট ও সত্তরের দশকে শিশু-কিশোরদের উপযোগী লেখার মাধ্যমে সাহিত্যজগতে তাঁর যাতায়াত শুরু হলেও, জাহানারা ইমামকে পাঠকহৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন এনে দেয় তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'একাত্তরের দিনগুলি' (প্রকাশকাল: ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ নয়টি মাসের প্রাত্যহিক উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দেশপ্রেম এবং গেরিলা যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার রোমাঞ্চকর বিবরণ তিনি লিখে রেখেছিলেন বিভিন্ন চিরকুট, ছিন্ন পাতা আর গোপন সংকেতে।
পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশের পর এই মর্মস্পর্শী ও শিহরণমূলক ঘটনাবৃত্তান্তগুলো সাধারণ মানুষের মনে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনি পুরোদমে লেখালেখিতে মগ্ন হন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
অন্য জীবন, বীরশ্রেষ্ঠ, জীবন মৃত্যু, চিরায়ত সাহিত্য, বুকের ভিতরে আগুন, নাটকের অবসান, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, নয় এ মধুর খেলা, ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস এবং প্রবাসের দিনলিপি।
'শহীদজননী' হয়ে ওঠা ও ঐতিহাসিক নেতৃত্ব
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রথম সন্তান শাফী ইমাম রুমী ছাত্রত্ব ত্যাগ করে দেশের মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর রুমী পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে ধরা পড়েন এবং শহীদ হন।
অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই তাঁর স্বামী শরিফ ইমামও অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।
বিজয় অর্জনের পর রুমীর সহযোদ্ধা ও বন্ধুরা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার 'মা' হিসেবে বরণ করে নেন। সেই থেকে তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে 'শহীদজননী' মর্যাদায় ভূষিত হন।
পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী, ধর্মান্ধ ও ঘাতক-দালালদের রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসনে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি জনসচেতনতা গড়ে তোলেন। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে তিনি হয়ে ওঠেন এক আপসহীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
১৯৯২ সালে তিনি 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি'র আহ্বায়ক মনোনীত হন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, তরুণ সমাজ এবং 'প্রজন্ম ৭১' ঐক্যবদ্ধ হয়।
সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থনে জাহানারা ইমাম ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক 'গণ-আদালত'।
প্রয়াণ ও চিরন্তন প্রেরণা
ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে এই মহীয়সী নারী শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁকে ঢাকায় এনে সমাহিত করা হয়।
মৃত্যুর পরেও, বাংলাদেশের মানুষের কাছে জাহানারা ইমাম আজও দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামের এক অনন্য এবং চির অম্লান প্রেরণার উৎস।
