বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের মসলায় সয়লাব বাংলাদেশের বাজার

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০৮:০০ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স
  • চলতি অর্থবছরে আমদানি হওয়া মসলার বড় অংশই এসেছে ভারত থেকে
  • আমদানি হওয়া জিরার প্রায় ৯৯.৭৯ শতাংশ ভারত থেকে এসেছে
  • ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মসলার চাহিদা বাড়ে
  • এক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ: বিশ্লেষক
  • বিকল্প উৎস দেশ হিসেবে ইরান, আফগানিস্তান, চীন, ভিয়েতনাম ও মিশরের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা

বাংলাদেশের মশলার বাজারে একক আধিপত্য তৈরি করেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩ কোটি ৬৯ লাখ কেজি মসলা। এরমধ্যে শুধু ভারত থেকেই আমদানি হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কেজি। এতে করে বাংলাদেশের মসলার বাজার পুরোটাই ভারতের মসলায় সয়লাব হয়ে গেছে।

সামনে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এ ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের মসলার বাজারে বাড়ছে চাহিদা। পশুর মাংস রান্নার জন্য এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরনের মসলার। তবে দেশের এই বিশাল চাহিদার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে, আর সেই আমদানির মূল উৎস হয়ে উঠেছে ভারত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মসলার বাজার পুরোপুরি ভারত নির্ভর হয়ে গেছে। একসময় ভারত থেকে সীমিত আকারে কাঁচামরিচ, হলুদ ও ধনিয়া আমদানি হলেও গত দেড় দশকে পরিস্থিতি পুরো বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের মোট মসলা আমদানির বড় অংশই আসে ভারত থেকে। বিশেষ করে জিরার বাজার প্রায় পুরোপুরি ভারতনির্ভর হয়ে পড়েছে। এলাচ ও দারুচিনির ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা দেখা গেছে জিরার ক্ষেত্রে। চলতি বছরে আমদানি হওয়া জিরার প্রায় ৯৯ দশমিক ৭৯ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে। মোট ১ কোটি ৯১ লাখ কেজির বেশি জিরা আমদানি হয়েছে দেশটি থেকে। অল্প পরিমাণ জিরা এসেছে আফগানিস্তান, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।

সূত্র মতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একই প্রবণতা ছিল। গেল অর্থবছরে দেশে মোট ৩ কোটি ৯৭ লাখ কেজির বেশি মসলা আমদানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশই আসে ভারত থেকে। শুধু জিরা আমদানি হয়েছে ২ কোটি ৫৭ লাখ কেজির বেশি, যার প্রায় পুরোটাই ভারতীয়।

জিরার পাশাপাশি এলাচ, দারুচিনি ও ধনিয়ার আমদানিও উল্লেখযোগ্য। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ২৪ লাখ কেজির বেশি এলাচ, ২১ লাখ কেজির বেশি দারুচিনি এবং প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কেজি ধনিয়া আমদানি হয়েছে।

ভারতের মসলা বোর্ড বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতীয় মশলা রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার টনে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩০ কোটি ভারতীয় রুপি, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশের বাজারে মসলা সরবরাহকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও ভারতীয় কোম্পানির আধিপত্য রয়েছে। শীর্ষ সরবরাহকারীদের মধ্যে রয়েছে মাভিহা ওভারসিজ, এমটিই এক্সিম প্রাইভেট লিমিটেড এবং ভিনয় কুমার কোম্পানি লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের রপ্তানির বড় অংশজুড়েই রয়েছে জিরা।

ভারতের বাইরে দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস দেশ হিসেবে উঠে এসেছে ভিয়েতনাম। দেশটি থেকে মূলত দারুচিনি ও গোলমরিচ আমদানি হচ্ছে। এছাড়া চীন, ইতালি ও ভুটান থেকেও বিভিন্ন মশলা আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কার থেকে এসেছে লবঙ্গের বড় অংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একক কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের বাজারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি নীতিতে পরিবর্তন বা মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ে বাংলাদেশের বাজারে। এতে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেইন এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘একটিমাত্র দেশের ওপর অতি নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে জিরার ফলন বিপর্যয়, শুল্কনীতি পরিবর্তন কিংবা মূল্যের অস্থিরতা দেখা দিলে সরাসরি তার বড় প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের খুচরা বাজারে, যা সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার মৌলভীবাজার এলাকার ব্যবসায়ী এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজার ভারত নির্ভর হয়েছে এটা সত্য। তবে এই নির্ভরতা একদিনে তৈরি হয়নি। সরকারি নীতি এই নির্ভরতা বাড়াতে সহযোগিতা করেছে। তবে এখন দেশের সরকারের উচিত নতুন বাজার খোঁজা। ইরান এবং আফগানিস্তান হতে পারে এর সঠিক বিকল্প। এছাড়া চীন এবং মিশর অনেক মশলা রপ্তানি করে থাকে। এদিকেও সরকার ও আমদানিকারকদের নজর দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক অস্থিরতা তৈরি হলে আমদানি নির্ভর বাজার বড় সংকটে পড়তে পারে। তাই এখন থেকেই বিকল্প উৎস দেশ খোঁজা এবং নতুন বাজার থেকে আমদানি বাড়াতে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন