শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রান্নার পর মাংস সবুজ হয়ে যায় কেন, জানুন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৭ এএম
সংগৃহীত ছবি
expand
সংগৃহীত ছবি

খুলনায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ব্যতিক্রমী ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পিকনিকের জন্য গরুর মাংস রান্না করতে গিয়ে কয়েকজন হঠাৎ লক্ষ্য করেন, কড়াইয়ে থাকা মাংসের রং ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক এ দৃশ্যে আতঙ্কিত হয়ে তারা রান্না করা মাংসভর্তি কড়াই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ও স্থানীয় থানায় যান।

পরে ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা ও জল্পনা।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, রান্না করা মাংস কি সত্যিই সবুজ হয়ে যেতে পারে? আর এমন হলে কি ধরে নিতে হবে যে মাংসটি নষ্ট বা বিষাক্ত?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিশেষ কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া, রান্নার পরিবেশ কিংবা মাংসের উপাদানের পরিবর্তনের কারণে কখনো কখনো মাংসে সবুজাভ রং দেখা দিতে পারে। তবে শুধু রং পরিবর্তন দেখেই মাংস নষ্ট বা বিষাক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ জানতে প্রয়োজন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের মতামত।

সবুজ দেখালেই মাংস নষ্ট, এমন নয়

খাদ্যবিজ্ঞানীদের মতে, মাংসের রং বিভিন্ন কারণে বদলাতে পারে। কখনো লাল থেকে বাদামি, কখনো গোলাপি, আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে সবুজাভ বা রংধনুর মতো ঝিলমিল রংও দেখা যেতে পারে।

এর একটি কারণ হলো মাংসের নিজস্ব রঞ্জক পদার্থ (মায়োগ্লোবিন)। এই প্রোটিনই মূলত মাংসের লাল রঙের জন্য দায়ী। রান্নার সময় তাপ, অক্সিজেন এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে মায়োগ্লোবিনের গঠন বদলে যেতে পারে। তখন মাংসে সবুজাভ আভা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রিজে রাখা মাংস, আগে থেকে সংরক্ষিত মাংস বা রান্নার সময় উচ্চ তাপে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে কখনো কখনো এমন হতে পারে। মাংস কাটার ধরন, আলোর প্রতিফলন এবং পেশির সূক্ষ্ম গঠনও এতে ভূমিকা রাখে।

এ কারণে অনেক সময় রোস্ট বিফ, হ্যাম বা পাতলা করে কাটা গরুর মাংসে সবুজ, বেগুনি কিংবা রংধনুর মতো ঝিলমিল রং দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা একে ইরিডেসেন্স বা বর্ণচ্ছটা বলেন। এটি মূলত আলোর প্রতিফলনের একটি ভৌত ঘটনা, কোনো রং মেশানোর ফল নয়।

তাহলে কি রং বদলে যাওয়া মাংস খাওয়া নিরাপদ

শুধু সবুজাভ রং দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি মাংসের গন্ধ স্বাভাবিক থাকে, পিচ্ছিল না হয়, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে এবং মেয়াদোত্তীর্ণ না হয়, তাহলে শুধু রং পরিবর্তন মানেই সেটি অনিরাপদ, এমন বলা যায় না।

তবে সবুজ রংয়ের আরেকটি কারণও থাকতে পারে। যদি ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা অন্যান্য অণুজীবের কারণে মাংস নষ্ট হতে শুরু করে, তাহলেও সবুজ বা ধূসর রং দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণত দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অস্বাভাবিক চটচটে অনুভূতিও থাকে।

অর্থাৎ শুধু রং নয়, গন্ধ, স্পর্শ এবং সংরক্ষণের অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে।

এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ, মাংসটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়নি। ঘটনাটি স্বাভাবিক রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলও হতে পারে, আবার সংরক্ষণ বা অন্য কোনো কারণে এমন হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা ছাড়া জানা সম্ভব নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।

রান্না হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে

অনেকে মনে করেন, মাংস পুরো বাদামি হয়ে গেলেই সেটি নিরাপদ। কিন্তু এটিও সব সময় ঠিক নয়। খাদ্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, কখনো মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হওয়ার আগেই বাদামি দেখাতে পারে, আবার ভালোভাবে রান্না হওয়ার পরও কিছুটা গোলাপি বা লালচে রং থেকে যেতে পারে।

তাই মাংস নিরাপদভাবে রান্না হয়েছে কি না, সেটি বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো খাবারের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা। বিশেষ করে কিমা বা গরুর মাংস রান্নার ক্ষেত্রে ফুড থার্মোমিটার ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সতর্কতা

মাংসের রং বদলে যাওয়া অবশ্যই অস্বাভাবিক। কিন্তু সবুজ দেখলেই যে সেটি বিষাক্ত বা রাসায়নিক মেশানো, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার উল্টোভাবে শুধু এই ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়াও ঠিক নয় যে সবই স্বাভাবিক।

মাংসে যদি দুর্গন্ধ থাকে, পিচ্ছিল লাগে, দীর্ঘদিন ভুল তাপমাত্রায় রাখা হয় বা ছত্রাকের মতো দাগ দেখা যায়, তাহলে সেটি না খাওয়াই নিরাপদ। আর কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে, খুলনার ঘটনার মতো, নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব।

সূত্র: সেন্টার ফর ফুড সেফটি, বিফ রিসার্চ ডটওআরজি, আমেরিকাস টেস্ট কিচেন ও অজি মিট

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন