

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ধূমপান ছাড়ার জার্নিতে একটা চিরন্তন সত্য কথা হলো- ‘সিগারেট ছাড়া কোনো কঠিন কাজ নয়, আমি জীবনে হাজারবার ছেড়েছি!’ মার্ক টোয়েনের এই রসাত্মক উক্তিটিই মূলত কোটি ধূমপায়ীর ভেতরের আসল অসহায়ত্ব।
বারবার প্রতিজ্ঞা করেও কেন মানুষ এই আসক্তি থেকে বের হতে পারে না, তার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং শারীরিক ফাঁদ। আর এই ফাঁদ কাটাতে ‘শেষ টান’এর মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং ‘ ট্রিপল নাইন (৯৯৯) মেথড’অ্যাপ্লাই করা দারুণ কার্যকরী হতে পারে।
আসুন জেনে নেওয়া যাক ধূমপান ছাড়ার প্রথম ৩ দিন, ৩ সপ্তাহ এবং ৩ মাসের সেই কঠিন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা কেমন হয় এবং কীভাবে তা জয় করা যায়।
কেন বারবার প্রতিজ্ঞা করেও সিগারেট ছাড়া যায় না?
ধূমপায়ীদের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই ‘শেষ টান ’ । অনেকেই ভাবেন, "আজ রাতে শেষ একটা খেয়ে আর জীবনেও খাব না।"
কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে, আপনি যখন কোনো কিছুকে 'শেষ' বলে বিদায় দেন, মস্তিষ্ক সেটাকে একটা 'ক্ষতি' বা বিয়োগান্তক ঘটনা হিসেবে ধরে নেয়। ফলে ওই শেষ সিগারেটের প্রতি মোহ আরও বেড়ে যায়।
সিগারেট খাওয়ার ১০ সেকেন্ডের মধ্যে নিকোটিন মস্তিষ্কে ডোপামিন (সুখের হরমোন) রিলিজ করে। মস্তিষ্ক এই সস্তা আনন্দকে ধরে রাখতে চায়। যখনই নিকোটিন কমে যায়, মস্তিষ্ক ছটফট করতে থাকে।
সিগারেট শুধু নিকোটিনের আসক্তি নয়, এটি একটি আচরণগত অভ্যাস। সকালের চা, বন্ধুদের আড্ডা, অফিসের কাজের চাপ, কিংবা বাথরুমে যাওয়া, প্রতিটি অভ্যাসের সাথে সিগারেট জড়িয়ে যায়।
ট্রিপল নাইন (৯৯৯) মেথড :
ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যখনই তীব্র ইচ্ছা জাগবে, তখন এই ট্রিপল নাইন মেথড ব্যবহার করতে পারেন:
১. ৯ মিনিট অপেক্ষা করুন: সিগারেটের তীব্র ক্রেভিং বা খাওয়ার ইচ্ছা সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিনিট স্থায়ী হয়। যখনই মন চাইবে, ঘড়ি ধরে ৯ মিনিট নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখুন। ৯ মিনিট পর দেখবেন ইচ্ছাটা অনেকটাই কমে গেছে।
২. ৯ বার গভীর শ্বাস নিন: ফুসফুসকে সিগারেটের ধোঁয়ার বদলে বিশুদ্ধ বাতাস দিন। ৯ বার বুক ভরে শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এটি আপনার নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত করবে এবং নিকোটিনের শূন্যতা ভুলিয়ে দেবে।
৩. ৯ চুমুক পানি পান করুন: যখনই হাত নিশপিশ করবে, এক গ্লাস পানি নিয়ে ৯টি ছোট ছোট চুমুক দিন। পানি শরীর থেকে নিকোটিন বের করে দিতে সাহায্য করে এবং মুখকে ব্যস্ত রাখে।
নিকোটিন ছাড়ার মানসিক ও শারীরিক লড়াইকে "Rule of Threes" দিয়ে খুব সুন্দরভাবে বুঝানো যায়:
১. প্রথম ৩ দিন (শারীরিক যুদ্ধ): শরীর থেকে নিকোটিন বের হওয়ার কারণে তীব্র ছটফটানি, মাথাব্যথা ও মেজাজ খিটখিটে হয়। মন বলবে, "একটা খেলে কিচ্ছু হবে না।" মুক্তির উপায়- বড় কোনো চিন্তা না করে শুধু আগামী ১ ঘণ্টার লক্ষ্য নিয়ে টিকে থাকা।
২. প্রথম ৩ সপ্তাহ (অভ্যাসের যুদ্ধ): শারীরিক কষ্ট কমলেও চায়ের আড্ডা বা কাজের ফাঁকের শূন্যতাগুলো মনকে পোড়ায়। মন প্ররোচনা দেবে, "তোমার তো কন্ট্রোল চলে এসেছে, আজ একটা খাওয়াই যায়!" এ সময় ট্রিগারগুলো এড়িয়ে চুইংগাম বা লবঙ্গ মুখে রাখা কার্যকর।
৩. প্রথম ৩ মাস (আত্মতুষ্টির ফাঁদ): শরীর চনমনে হয়ে উঠলে মন ফাঁদ পাতে, "আমি তো এখন মুক্ত, জাস্ট টেস্ট করার জন্য একটা টান দিই।" মনে রাখবেন, ৯০% মানুষ এই 'একটা টানের' ফাঁদে পড়েই আবার আসক্ত হন।
ধূমপান ছাড়াকে কোনো 'ত্যাগ' নয়, বরং নিজের 'স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া' হিসেবে দেখাই জয়ের মূল চাবিকাঠি।
