

ক্যানসার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ, যা মানবদেহের কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। ফুসফুস, স্তন, কোলন, লিভার এবং প্রোস্টেট ক্যানসারসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে শত রকমের ক্যানসার হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যে ক্যানসারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়, তার মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার (Cervical Cancer) অন্যতম এবং সবচেয়ে মারাত্মক।
এটি বিশ্বব্যাপী নারীদের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ক্যানসার শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নারীদের জরায়ুর নিচের অংশটিকে বলা হয় জরায়ুমুখ বা সার্ভিক্স (Cervix)। এই অংশে যে ক্যানসার হয়, তাকেই জরায়ুমুখ ক্যানসার বলে। বিশ্বব্যাপী নারীদের ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারের দিক থেকে এটি ৪র্থ স্থানে রয়েছে, তবে বাংলাদেশে এর অবস্থান ২য়।
সাধারণত ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই ক্যানসার বেশি দেখা যায়। একে জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকিপূর্ণ বয়স বলা হয়। বিশ্বজুড়ে এই ক্যানসারে যত মৃত্যু হয়, তার ৯০% ঘটে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)। এইচপিভি ভাইরাসের ১০০টিরও বেশি ধরন (স্ট্রেন) রয়েছে। এর মধ্যে ১৪-১৫টি ধরন খুবই বিপজ্জনক।
বিশেষ করে এইচপিভি-১৬ এবং এইচপিভি-১৮- এই দুটি ধরনই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ভাগ জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী।
যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস নারীদের জরায়ুমুখে ছড়ায়। ৮০% নারীর শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে ২ বছরের মধ্যে এই ভাইরাস আপনাআপনি দূর হয়ে যায়।
জরায়ুমুখ ক্যানসার
কিন্তু বাকি ২০% নারীর শরীরে ভাইরাসটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। এটি ধীরে ধীরে জরায়ুমুখের কোষে পরিবর্তন ঘটায় (যাকে CIN ১, ২, ৩ বা ক্যানসারপূর্ব অবস্থা বলা হয়) এবং অবশেষে ক্যানসারে রূপ নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে ১০ থেকে ২০ বছর সময় লাগে।
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ কাজ করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়:
১. বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে মা হওয়া।
২. ঘন ঘন সন্তান ধারণ করা।
৩. স্বামীর একাধিক বিয়ে বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক এবং একাধিক যৌনসঙ্গী থাকা।
জরায়ুমুখ ক্যানসারের ধরণ
৪. একটানা ৫ বছরের বেশি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (পিল) সেবন করা।
৫. অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা, ধূমপান এবং জর্দা-তামাক সেবন।
৬. জরায়ুমুখ ক্যানসারের টিকা (HPV Vaccine)
সব ক্যানসার প্রতিরোধ করা না গেলেও জরায়ুমুখ ক্যানসার টিকা দেওয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ২০০৬ সালে এই টিকা প্রথম বাজারে আসে।
বাজারে মূলত ৩ ধরনের টিকা পাওয়া যায়:
বাইভ্যালেন্ট: ২টি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে (বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া যায়)।
কোয়াড্রিভ্যালেন্ট: ৪টি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে (বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারিভাবে এটি দেওয়া হচ্ছে)।
নোনাভ্যালেন্ট: ৯টি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে।
ছবি সংগৃহীত
হ্যাঁ, সম্পূর্ণ নিরাপদ। এই টিকা তৈরিতে রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভাইরাসের বাইরের প্রোটিনের (L1 প্রোটিন) মতো হুবহু কণা তৈরি করা হয়।
এতে ভাইরাসের কোনো আসল ডিএনএ থাকে না। ফলে টিকা থেকে ক্যানসার বা কোনো সংক্রমণ হওয়ার সুযোগ নেই।
টিকা দেওয়ার পর এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল করে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। টিকা দেওয়ার ১ মাসের মধ্যে রক্তে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং ৬ মাসের মধ্যে তা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দীর্ঘদিন শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
জরায়ুমুখ ছাড়াও এটি যোনীপথ, যোনীমুখ ও মুখের ক্যানসার প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রতিরোধ করতে পারে।
টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের মূলত ৩টি গ্রুপে ভাগ করা হয়:
টার্গেট গ্রুপ (৯ থেকে ১৪ বছর): এটি টিকা দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই বয়সের কিশোরীদের জরায়ুমুখের কোষগুলো নরম থাকে এবং তাদের যৌন সংস্পর্শ ঘটে না। তাই এই সময়ে টিকা দিলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
ক্যাচআপ গ্রুপ (১৫ থেকে ২৬ বছর): এই বয়সীদেরও টিকা দেওয়া যাবে।
কনসিডারেবল গ্রুপ (২৭ থেকে ৪৫ বছর): এই বয়সেও টিকা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে, তবে এর কার্যকারিতা বেশ সীমিত। কারণ এই বয়সে সাধারণত যৌন মিলন বা এইচপিভি সংক্রমণ ইতিমধ্যে ঘটে যেতে পারে।
ছবি সংগৃহীত
তাই এই বয়সী নারীদের জন্য টিকার চেয়ে 'স্ক্রিনিং' (Screening) বা নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করা বেশি জরুরি, যাতে ক্যানসারপূর্ব অবস্থা থাকতেই চিকিৎসা করা যায়।
বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-এর অধীনে বিনামূল্যে সিঙ্গেল ডোজ (এক ডোজ) এইচপিভি ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন চলে।
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫ম থেকে ৯ম শ্রেণির ছাত্রী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীরা এই সুবিধা পায়। ৬০ লাখেরও বেশি কিশোরীকে এই সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।