শনিবার
০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা, যা বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

ডেঙ্গু মৌসুম এলেই চারপাশ থেকে নানারকম পরামর্শ ও তথ্যের বন্যা বয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু পরামর্শ অভিজ্ঞতা থেকে আসলেও, বেশিরভাগেরই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ভুল ধারণার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নিতে দেরি করায় অনেক সময় সাধারণ রোগীও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েন।

ডেঙ্গু নিয়ে ১০টি প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য

১. প্লাটিলেট কমলেই কি রোগী মারাত্মক ঝুঁকিতে?

ভুল ধারণা: প্লাটিলেট কমে গেলেই ধরে নেওয়া হয় রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা মূল্যায়নের জন্য শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যাই শেষ কথা নয়। অনেক সময় প্লাটিলেট ৫০ হাজারের নিচে নামলেও রোগী সম্পূর্ণ স্থিতিশীল থাকতে পারেন।

চিকিৎসকেরা প্লাটিলেটের পাশাপাশি রোগীর রক্তচাপ, পালস, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং কোনো রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা- এসব সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দেখে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করেন।

২. প্লাটিলেট কমলেই কি রক্ত দিতে হবে?

ভুল ধারণা: প্লাটিলেট ১ লাখ বা তার নিচে নামলেই রক্ত বা প্লাটিলেট দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করা।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট কিছুটা কমে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেবল সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্লাটিলেট দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।

রোগীর শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা বা অন্যান্য জটিলতা আছে কিনা, তা দেখে একমাত্র চিকিৎসকই রক্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।

অপ্রয়োজনীয় রক্ত বা প্লাটিলেট গ্রহণ উল্টো শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

৩. পেঁপে পাতার রস কি ডেঙ্গুর নিশ্চিত নিরাময়?

ভুল ধারণা: পেঁপে পাতার রস খেলেই ডেঙ্গু পুরোপুরি সেরে যায়।

সঠিক তথ্য: কিছু ছোটখাটো গবেষণায় পেঁপে পাতার রসের সম্ভাব্য কিছু গুণের কথা বলা হলেও, এটি ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট বা নিশ্চিত কোনো চিকিৎসা- এমন কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই।

তাই প্রথাগত চিকিৎসার বদলে শুধু পেঁপে পাতার রসের ওপর ভরসা করে ঘরে বসে থাকা বিপজ্জনক।

৪. জ্বর কমে গেলেই কি রোগ মুক্তি?

ভুল ধারণা: জ্বর ছেড়ে গেছে মানেই ডেঙ্গু ভালো হয়ে গেছে।

সঠিক তথ্য: এটি ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক ভুল ধারণা। জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাকে বলা হয় 'ক্রিটিক্যাল ফেজ' বা সংকটময় সময়।

এই সময়েই রোগীর শরীর থেকে তরল উপাদান বের হয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া (শক সিন্ড্রোম) কিংবা রক্তক্ষরণের মতো বড় জটিলতাগুলো দেখা দেয়। তাই জ্বর কমার পরই রোগীকে সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

৫. ডেঙ্গু কি শুধু শিশুদের রোগ?

ভুল ধারণা: ডেঙ্গু কেবল শিশুদেরই বেশি ক্ষতি করে, বড়দের তেমন ভয় নেই।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গু যেকোনো বয়সের মানুষেরই হতে পারে। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

৬. একবার ডেঙ্গু হলে কি আর হয় না?

ভুল ধারণা: একবার ডেঙ্গু হয়ে গেলে শরীরে চিরদিনের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গু ভাইরাসের মোট চারটি ভিন্ন ধরন (সেরোটাইপ) রয়েছে। আপনি একটি ধরনে আক্রান্ত হলে কেবল সেই নির্দিষ্ট ধরনের বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা পাবেন। বাকি তিনটি ধরন দিয়ে আপনি আবারও আক্রান্ত হতে পারেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, দ্বিতীয় বা পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু হলে রোগীর অবস্থা প্রথম বারের চেয়েও বেশি গুরুতর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৭. এডিস মশা কি শুধু নোংরা পানিতে জন্মায়?

ভুল ধারণা: নর্দমা বা ড্রেনের নোংরা পানি পরিষ্কার রাখলেই ডেঙ্গু থেকে বাঁচা সম্ভব।

সঠিক তথ্য: এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভেতরে বা আশেপাশে জমে থাকা পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, এসির ট্রে, ফ্রিজের নিচের পানি জমার জায়গা, বালতি, ছাদের ড্রাম কিংবা ডাবের খোসায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতেই এই মশা বংশবৃদ্ধি করে। তাই ঘরের ভেতরের পরিষ্কার পানিও জমতে দেওয়া যাবে না।

৮. মশা কি শুধু রাতে কামড়ায়?

ভুল ধারণা: মশার কামড় থেকে বাঁচতে কেবল রাতে মশারি টাঙালেই চলবে।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, বিশেষ করে সকালের দিকে এবং বিকেলের শেষ ভাগে সবচেয়ে বেশি কামড়ায়।

তাই দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকা এবং শিশুদের ফুল হাতা পোশাক পরানো জরুরি।

৯. অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই কি ডেঙ্গু ভালো হয়?

ভুল ধারণা: শরীর বেশি খারাপ হলে বা জ্বর না কমলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করা।

সঠিক তথ্য: ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, আর অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে কেবল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে।

তাই ডেঙ্গু নিরাময়ে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো খেলে শরীরের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।

১০. ডেঙ্গু হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?

ভুল ধারণা: ডেঙ্গু পজিটিভ আসা মানেই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।

সঠিক তথ্য: সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয় না। রোগী যদি পর্যাপ্ত তরল খাবার খেতে পারেন, নিয়মিত প্রস্রাব হয় এবং কোনো বিপজ্জনক লক্ষণ না থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব।

তবে তীব্র পেটব্যথা, ঘন ঘন বমি, শরীর অতিরিক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে করণীয়

তরল খাবার: রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওআরএস (ওরস্যালাইন), ডাবের পানি, স্যুপ ও ফলের রস পান করান যেন শরীরে তরলের ঘাটতি না হয়।

বিশ্রাম: রোগীকে সম্পূর্ণ শারীরিক বিশ্রামে রাখতে হবে।

সঠিক ওষুধ: জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য কেবল 'প্যারাসিটামল' জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভুলেও আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানো যাবে না; এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সুরক্ষাই প্রধান অস্ত্র

ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় বের করে আপনার ঘর, বারান্দা এবং ছাদ পরীক্ষা করুন।

কোথাও যেন পানি জমে না থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো মনগড়া পরামর্শ বা গুজবে কান না দিয়ে, যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Canada VS Morocco
Scheduled
04 Jul, 11:00 PM
VS
World Cup