

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দাঁতের স্বাস্থ্য যে কেবল মুখের সৌন্দর্য বা চিবিয়ে খাওয়ার ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো শরীরের সুস্থতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত- এই সত্যটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় "অরাল-সিস্টেমিক কানেকশন" (Oral-Systemic Connection) বা মুখের স্বাস্থ্যের সাথে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্ক।
১. দাঁতের ক্যাভিটি ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি কোনো সাধারণ গর্ত বা ক্ষয় নয়, এটি মূলত একটি সক্রিয় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন।
আমাদের মুখে স্ট্রেপটোকক্কাস মিউটানস সহ কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া বাস করে। আমরা যখন শর্করা বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাই, তখন এই ব্যাকটেরিয়াগুলো সেই খাবার থেকে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেল বা শক্ত আবরণকে গলিয়ে ফেলে এবং ক্যাভিটি তৈরি করে।
যখন ক্যাভিটি গভীর হয়ে দাঁতের ভেতরের নরম অংশ (পাল্প) পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা রক্তনালি ও স্নায়ু ব্যাকটেরিয়া দ্বারা মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হয়।
২. হার্ট, ফুসফুস ও মস্তিষ্কে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার
দাঁতের মাড়ি এবং পাল্পের ভেতরে প্রচুর রক্তনালি থাকে। ক্যাভিটি বা মাড়ির রোগ (Periodontitis) থাকলে এই পথ দিয়ে ব্যাকটেরিয়া সহজেই মূল রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হার্টের ক্ষতি (Infective Endocarditis): রক্তে মিশে যাওয়া মুখের ব্যাকটেরিয়া হৃদপিণ্ডে পৌঁছে হার্টের ভেতরের দেয়াল এবং হার্টের ভালভে (Heart Valves) জমাট বাঁধতে পারে।
একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইনফেক্টিভ এন্ডোকার্ডাইটিস বলা হয়। এর ফলে হার্টের ভালভ অচল হয়ে যেতে পারে এবং হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি বাড়ে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি (Atherosclerosis & Stroke): ব্যাকটেরিয়া রক্তনালির দেয়ালে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে। এর ফলে রক্তনালিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া বা প্লাক (Plaque) গঠন ত্বরান্বিত হয় (Atherosclerosis), যা ধমনীকে সরু করে দেয়।
এই প্লাক কোনো কারণে ভেঙে রক্তনালি বন্ধ করে দিলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হুট করে স্ট্রোক হতে পারে।
ফুসফুসের সংক্রমণ (Respiratory Infections): মুখের এই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো লালার মাধ্যমে বা শ্বাসের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করে নিউমোনিয়া বা ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) এর মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
৩. ডায়াবেটিস ও দাঁতের ক্ষয়ের মারাত্মক চক্র
ডায়াবেটিস এবং মুখের স্বাস্থ্যের সম্পর্কটি একটি দ্বিমুখী বিপজ্জনক চক্র (Two-way street)।
দ্রুত দাঁতের ক্ষয়: ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে এবং লালা (Saliva)-তে গ্লুকোজ বা চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। এই অতিরিক্ত চিনি মুখের ব্যাকটেরিয়ার প্রধান খাদ্য, যার ফলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং দাঁতে ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগ খুব দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে শরীরের শ্বেত রক্তকণিকা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। ফলে দাঁতের ইনফেকশন দ্রুত হাড় ও রক্তে ছড়িয়ে পড়ে।
হৃদরোগের দ্বিগুণ ঝুঁকি: দাঁতের ইনফেকশন শরীর জুড়ে যে ক্রনিক প্রদাহ তৈরি করে, তা ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দেয়।
ফলে রক্তের চিনি নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাদের হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি সুস্থ মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
৪. করণীয় এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা
"দাঁতে ব্যথা হলেই কেবল ডাক্তারের কাছে যেতে হবে"- এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। ব্যথা শুরু হওয়া মানে ইনফেকশনটি দাঁতের স্নায়ু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তাই প্রাথমিক অবস্থাতেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ:
নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ: বছরে অন্তত দুবার (প্রতি ৬ মাসে) ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে দাঁত পরীক্ষা এবং স্কেলিং করানো উচিত। এতে একদম প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যাভিটি ধরা পড়ে।
ডেন্টাল ফিলিং (Filling): ক্যাভিটি যদি প্রাথমিক বা মাঝারি অবস্থায় থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত অংশ পরিষ্কার করে কম্পোজিট বা জিআই ফিলিং করে দাঁত সিল করে দেওয়া হয়। এতে ব্যাকটেরিয়া আর রক্তে ছড়াতে পারে না।
রুট ক্যানেল ও ক্যাপ (Root Canal & Crown): ইনফেকশন যদি দাঁতের মজ্জা বা পাল্প পর্যন্ত চলে যায়, তবে রুট ক্যানেল চিকিৎসার মাধ্যমে ভেতরের সব ব্যাকটেরিয়া ও মৃত টিস্যু পরিষ্কার করে দাঁতটি বাঁচানো হয় এবং সুরক্ষার জন্য ওপরে ক্যাপ বা ক্রাউন পরানো হয়।
মুখের সঠিক পরিচ্ছন্নতা: দিনে দুইবার ফ্লুরাইডযুক্ত পেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা এবং অন্তত একবার ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করে দাঁতের ফাঁকের ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক।
মুখের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা মানে পুরো শরীরের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। দাঁতের একটি ছোট ক্যাভিটি অবহেলা করলে তা রক্তনালির মাধ্যমে আপনার হার্ট ও মস্তিষ্ককে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তাই সুস্থ হার্ট এবং দীর্ঘায়ুর জন্য মুখের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কেবল সৌন্দর্য নয়, জীবনের প্রয়োজনে জরুরি।

