

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গর্ভাবস্থার প্রজননক্ষম বয়সে অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, পারিবারিক ইতিহাস, অধিক বয়সে গর্ভধারণ কিংবা পিসিওএস (PCOS)-এর মতো হরমোনজনিত সমস্যা এর মূল কারণ।
সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে এটি প্রথম ধরা পড়ে, তবে স্বস্তির বিষয় হলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পর রক্তের শর্করা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
যেভাবে তৈরি হয় এই জটিলতা
সন্তানধারণের পর প্লাসেন্টা বা ফুল থেকে বিশেষ কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মায়ের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় (ইনসুলিন রেজিসট্যান্স)। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার ২৪ সপ্তাহের পর বা তৃতীয় ট্রাইমস্টারে ইনসুলিনের কার্যকারিতা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
এই সময় শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মায়ের অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরির চেষ্টা করে। কিন্তু অগ্ন্যাশয় যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখনই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গিয়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়।
মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি
সঠিক সময়ে এই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করলে মা ও সন্তান- উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়। মায়ের ক্ষেত্রে প্রি-একলাম্পশিয়া, একলাম্পশিয়া, জরায়ুতে পানির পরিমাণে অস্বাভাবিকতা ও কিটোঅ্যাসিডোসিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে মায়ের রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ প্লাসেন্টা পার হয়ে শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে শিশু অস্বাভাবিক মোটা বা অতিরিক্ত ওজনের (ম্যাক্রোসোমিয়া) হয়ে জন্মায়। এছাড়া গর্ভস্থ শিশুর আকস্মিক মৃত্যু, নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব, প্রসবকালীন নানা জটিলতা এবং জন্মগ্রহণের পরপরই শিশুর রক্তের শর্করা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) ঝুঁকি থাকে।
রক্তের শর্করার কাঙ্ক্ষিত মাত্রা
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে শর্করার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অন্যান্য সাধারণ ডায়াবেটিস রোগীদের থেকে কিছুটা আলাদা।
খাবার খাওয়ার আগে: ৫.৩ মিলিমোল/লিটার-এর কম।
প্রতি বেলা খাবারের ২ ঘণ্টা পর: ৬.৭ মিলিমোল/লিটার-এর কম।
চিকিৎসা ও শর্করা নিয়ন্ত্রণের উপায়
প্রাথমিকভাবে সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা ও নিয়মিত হালকা শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়:
ক্যালরি নির্ধারণ: মায়ের ওজন অনুযায়ী ক্যালরি ঠিক করা হয়। স্বাভাবিক ওজনের মায়ের জন্য প্রথম ট্রাইমস্টারে দৈনিক কেজি প্রতি ৩০ কিলোক্যালরি এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমস্টারে কেজি প্রতি ৩৫ কিলোক্যালরি গ্রহণ করা উচিত।
খাদ্যের উপাদান: মোট ক্যালরির ৩৩-৪০% জটিল ও লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স শর্করা, ২০% প্রোটিন এবং ৪০%-এর কম ফ্যাট থেকে আসা উচিত।
শারীরিক পরিশ্রম: দৈনিক ২৫ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা প্রয়োজন।
ইনসুলিন থেরাপি: জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেও যদি এক সপ্তাহের মধ্যে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে ইনসুলিন শুরু করতে হয়। ইনসুলিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করে শিশুর শরীরে যায় না, তাই গর্ভাবস্থায় শর্করা নিয়ন্ত্রণে এটিই একমাত্র নিরাপদ ও পরীক্ষিত চিকিৎসা পদ্ধতি।



