

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ক্যালেন্ডারে পাতা জুড়ে চলছে বৈশাখ মাস আর বৈশাখ মাস মানেই প্রকৃতিতে তাপদ্রাহ আর কালবৈশাখী ঝড়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তো রয়েছেই বৃষ্টি, বজ্রপাত, মেঘ ডাকা, বিদ্যুৎ চমকানো, বাজ পড়ার মতো আবহমান গ্রাম বাংলার প্রকৃতির নানা রকম রূপ।
হঠাৎ করেই জানালার কাঁচে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ার শব্দ। আকাশ জুড়ে মেঘ ধূসর হয়ে আসে। দূরের গাছগুলো ঝাপসা লাগে। বাতাসে একটা ভেজা মাটির গন্ধ। সেই গন্ধ নাকে ঢুকতেই মনটা একটু নরম হয়ে যায়। সাথে অফিসের কি-বোর্ড চাপানো টুকটাক কর্মব্যস্ততা থেমে যায়। সময় ধীর হয়। এই ধীর হয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই কোথা থেকে যেন মাথায় আসে এখন যদি এক প্লেট গরম খিচুড়ি পাওয়া যেত!
গভীর যে, এই অনুভূতিটা কাজ করছে এটা অতি পরিচিত। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় যে, বৃষ্টি মানেই খিচুড়ি কথা মাথায় আসে। খিচুড়ি আসলে কেবল একটি খাবার নয়। এটি এক ধরনের অনুভূতি, যা আমাদের ভেতরে জমে থাকা বহু দিনের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে আছে। ছোটবেলার বৃষ্টিভেজা দিনগুলোর কথা মনে পড়লেই এই সম্পর্কটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন বৃষ্টি মানেই ছিল ছুটি, ছিল অলস দুপুর, ছিল রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পেঁয়াজ-হলুদের গন্ধ। হাঁড়িতে ধীরে ধীরে ফুটতে থাকা চাল আর ডালের সঙ্গে যেন জমে উঠত এক অদৃশ্য উত্তেজনা কখন খেতে ডাকবে!
সেই গরম খিচুড়ির প্লেট, পাশে ডিম ভাজি বা বেগুন ভাজা, বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টি এই দৃশ্যটা শুধু খাবারের নয়, এটি নিরাপত্তা আর স্বস্তির এক নিখুঁত ছবি। মনে হতো, পৃথিবীর সব অস্থিরতা দরজার বাইরে থেমে আছে। এই যে শান্তি, এই যে ঘরের উষ্ণতা এসবই খিচুড়ির স্বাদের সঙ্গে মিশে আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে।
তবে এই অভ্যাসের শেকড় যে অন্তরের গভীরে। আমাদের কৃষিভিত্তিক জীবন, বিশেষ করে গ্রামবাংলার বাস্তবতায় বর্ষা মানেই ছিল একদিকে কাজের সময়, আবার অন্যদিকে থেমে যাওয়ার সময়ও। টানা বৃষ্টিতে যখন বাইরে যাওয়া কঠিন হতো, তখন ঘরে যা আছে তা দিয়েই রান্না করতে হতো। চাল আর ডাল এই দুটো উপকরণ প্রায় সব ঘরেই থাকত। সেখান থেকেই তৈরি হতো খিচুড়ি, যা সহজ, পুষ্টিকর এবং পেট ভরানো। ধীরে ধীরে এই বাস্তব প্রয়োজনই পরিণত হয়েছে সংস্কৃতিতে।
গ্রামের টিনের চালের ওপর ঝমঝমবৃষ্টির শব্দ, উঠানে জমে থাকা পানি, কাদায় ডোবা পা এসবের মাঝেও এক হাঁড়ি খিচুড়ি ঘিরে বসে খাওয়ার যে অভ্যাস, তা শুধু ক্ষুধা মেটানোর নয়, এটি একসঙ্গে থাকার আনন্দও তৈরি করে। এই মিলেমিশে থাকা, এই ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস খিচুড়িকে একধরনের সামাজিক প্রতীকে পরিণত করেছে।
শহর বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, কিন্তু বৃষ্টির দিনের অনুভূতি খুব একটা বদলায়নি। বরং ব্যস্ত শহুরে জীবনে বৃষ্টি যেন একটু বিরতি এনে দেয়। রাস্তা ফাঁকা লাগে, সময় ধীর হয়, মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। সেই থেমে যাওয়া সময়টায় সহজ, উষ্ণ, ঝামেলাহীন কিছু খেতে ইচ্ছে করে খিচুড়ি ঠিক সেই জায়গাটায় গিয়ে মিলে যায়।
আবহাওয়ার প্রভাবও কম নয়। বৃষ্টির দিনে শরীর গরম ও আরামদায়ক খাবার চায়, কিন্তু ভারী কিছু নয়। খিচুড়ির নরম, উষ্ণ স্বভাব শরীরকে যেমন আরাম দেয়, তেমনি মনকেও শান্ত করে। এই শারীরিক আর মানসিক আরামের মিলনই খিচুড়ির প্রতি টানকে আরও গভীর করে তোলে।
মজার বিষয় হলো, খিচুড়ি আমরা অন্য সময়েও খাই, কিন্তু তখন সেটা কেবল ‘খাওয়া’। আর বৃষ্টির দিনে? সেটি হয়ে ওঠে ‘অনুভব’। একই স্বাদ, একই উপকরণ তবু অন্যরকম লাগে। কারণ তখন চারপাশের আবহাওয়া, স্মৃতি আর মন সব একসঙ্গে মিশে যায়।এই মিশে যাওয়ার জায়গাটাই আসল। খিচুড়ি তখন আর শুধু খাবার থাকে না, হয়ে ওঠে ঘরের প্রতীক, মাটির প্রতীক, আপনজনের প্রতীক। তাই বৃষ্টি নামলেই আমরা খিচুড়ির কথা ভাবি শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং একটু ফিরে যাওয়ার জন্য, একটু থেমে থাকার জন্য, নিজের ভেতরে একটু আশ্রয় খুঁজে নেওয়ার জন্য।
শেষ পর্যন্ত, এক প্লেট গরম খিচুড়ির ভেতরেই আমরা খুঁজে পাই আমাদের জীবনের সহজ ছন্দ, শিকড়ের টান আর সেই নির্ভেজাল শান্তি, যা হয়তো কর্মব্যস্ত জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়।
মন্তব্য করুন