

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইউরোপিয়ান পাইড ফ্লাইক্যাচার (Ficedula hypoleuca) নামক ক্ষুদ্র পাখির এই বিশেষ আচরণটি প্রাণীবিজ্ঞানে পলিগাইনি (Polygyny) বা বহুস্ত্রী গ্রহণ এবং প্রতারণামূলক আচরণ (Deceptive behavior) গবেষণার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত।
বাহ্যিকভাবে এটিকে মানুষের মতো বিশ্বাসঘাতকতা মনে হলেও, এটি মূলত একটি জটিল বিবর্তনীয় কৌশল (Evolutionary Strategy)।
বসন্তকালে একটি পুরুষ পাইড ফ্লাইক্যাচার প্রথম একটি স্ত্রী পাখির সাথে জোড় বাঁধে এবং তাদের প্রাথমিক বাসায় ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এখানেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রথম স্ত্রী পাখি ডিম পাড়া শুরু করার পরপরই পুরুষ পাখিটি তার প্রথম সঙ্গীকে ফেলে কয়েকশ মিটার দূরে (কখনও কখনও ১-২ কিলোমিটার) একটি নতুন এলাকা বেছে নেয়।
সেখানে গিয়ে সে আরেকটি বাসা তৈরি করে দ্বিতীয় একটি সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা করে। প্রথম স্ত্রী পাখির অজ্ঞাতে সে দুই ভিন্ন জায়গায় দুই পরিবার গড়ে তোলার চেষ্টা করে, যা জীববিজ্ঞানে "পলিটেরিটোরিয়াল পলিগাইনি" (Polyterritorial polygyny) নামে পরিচিত।
দ্বিতীয় স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করতে পুরুষ পাখিটি তার গানের ধরন বদলে ফেলে। গবেষণায় পাওয়া ১৭টি পুরুষ পাখির রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:
গানের দৈর্ঘ্য হ্রাস: সঙ্গীহীন অবস্থায় একটি পুরুষ পাখির প্রতিটি গানের গড় দৈর্ঘ্য থাকে প্রায় ২ সেকেন্ড। কিন্তু প্রথম স্ত্রী পাখির সাথে জোড় বাঁধার পর দ্বিতীয় এলাকায় গিয়ে গাওয়া গানের দৈর্ঘ্য কমে দাঁড়ায় প্রায় ১.৭ সেকেন্ডে।
শব্দের পুনরাবৃত্তি: গানগুলো আগের চেয়ে ছোট হলেও তাতে নির্দিষ্ট কিছু শব্দের বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। পুরুষ পাখিটি এমনভাবে গান গায় যেন সে পুরোপুরি সঙ্গীহীন (Bachelor) এবং নতুন একটি সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত।
পুরুষ পাখির এই চালবাজি সত্ত্বেও স্ত্রী পাখিরা সহজে প্রতারিত হয় না। গবেষণায় ২৯টি স্ত্রী পাখির ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের মধ্যে ২১টি পাখিই (প্রায় ৭২.৪%) সেইসব পুরুষের গান বেছে নিয়েছে যারা সম্পূর্ণ সঙ্গীহীন।
স্ত্রী পাখিরা গানের সূক্ষ্ম পরিবর্তন- যেমন গানের সময়কাল, কম্পাঙ্ক এবং শব্দের বৈচিত্র্য থেকে সহজেই বুঝে ফেলে পুরুষটি সত্যিই একা, নাকি তার ইতিমধ্যেই কোনো সঙ্গী আছে।
পুরুষ পাখি যদি প্রথম স্ত্রী পাখির সাথে সময় ব্যয় করে থাকে, তবে তার শারীরিক ক্লান্তি ও সময় স্বল্পতার প্রভাব তার কন্ঠে ফুটে ওঠে।
প্রথম স্ত্রী পাখির কাছে ফিরে যাওয়ার তাড়াহুড়ো থাকার কারণে দ্বিতীয় এলাকায় তার গানের গুণগত মান সিঙ্গেল পুরুষ পাখির মতো নিখুঁত হয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আচরণের মূলে কোনো মানবিক প্রতারণার মানসিকতা নেই, বরং এটি স্রেফ বংশবৃদ্ধির তাগিদ (Reproductive Success)।
প্রকৃতিতে নিজের জিন বা বংশধর ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সর্বোচ্চ করাই এর প্রধান লক্ষ্য। পুরুষ পাখিটি চায় একাধিক স্ত্রী পাখির মাধ্যমে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাচ্চা লালন-পালন করতে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় স্ত্রী পাখিটি যদি ভুল করে ইতোমধ্যে জোড় বাঁধা কোনো পুরুষের সাথে বাসা বাঁধে, তবে সে প্রতারিত হয়।
কারণ পুরুষ পাখিটি পরবর্তীতে আবার প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে বাচ্চা পালনে সাহায্য করে, ফলে দ্বিতীয় স্ত্রী পাখি একাই বাচ্চা বড় করতে হয়। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়মেই স্ত্রী পাখিরা গানের সুর শুনে প্রতারক পুরুষদের এড়িয়ে চলার বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছে।


