

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


প্রাচীন মিসরীয়দের বিড়ালপ্রীতি ইতিহাসের এক অনন্য ও বিস্ময়কর অধ্যায়। ফারাওদের আমল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা এই বিশেষ সম্পর্কের বহু নিদর্শন আজও টিকে রয়েছে।
মিসরীয়রা অসংখ্য বিড়ালকে মমি করে সংরক্ষণ করেছিল এবং এমনকি বিশ্বের প্রাচীনতম পোষা প্রাণীর কবরস্থানও তারা তৈরি করেছিল, যেখানে সুন্দর কলার পরা বিড়ালের সন্ধান মেলে।
গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের মতে, প্রিয় বিড়ালের মৃত্যুতে মিসরীয়রা শোকের চিহ্ন হিসেবে নিজেদের ভ্রু পর্যন্ত কামিয়ে ফেলত।
বিড়ালকে এত গুরুত্ব দেওয়ার প্রধান কারণ ছিল মিসরীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস। ২০১৮ সালে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট-এর এক প্রদর্শনীতে উঠে আসে যে, মিসরীয়রা তাদের দেবদেবী ও ফারাওদের মধ্যে বিড়ালের দ্বৈত বৈশিষ্ট্য দেখতে পেত।
তাদের চোখে বিড়াল একদিকে যেমন স্নেহশীল, রক্ষক ও বিশ্বস্ত; অন্যদিকে তেমনই স্বাধীনচেতা, আক্রমণাত্মক ও ভয়ংকর।
এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে গিজার মহাস্ফিংক্স কিংবা সিংহমুখী দেবী সেখমেত ও দেবী বাসতেতের মূর্তি ও চিত্রাবলীতে। বিশেষ করে দেবী বাসতেতের কাছে বিড়াল ছিল অত্যন্ত পবিত্র।
ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও বিড়ালের অপরিসীম ভূমিকা ছিল। ইঁদুর ও বিষাক্ত সাপ শিকারে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় বিড়াল মিসরীয়দের ঘরের অতি প্রিয় সদস্য হয়ে ওঠে।
বিড়ালের প্রতি ভালোবাসার গভীরতা এতটাই ছিল যে, শিশুদের নাম বা ডাকনামও বিড়ালের নামে রাখা হতো- যেমন মেয়েদের নাম দেওয়া হতো 'মিট', যার শাব্দিক অর্থ বিড়াল।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০০ সালের দিকেই মিসরে বিড়ালকে অতি আদরে সমাহিত করার প্রচলন শুরু হয়। তবে এই অন্ধ শ্রদ্ধার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম বাস্তবতা। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৩০০ সালের মধ্যে প্রায় শিল্পপর্যায়ে বিড়াল প্রজনন করানো হতো কেবল দেবতাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার জন্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, লাখ লাখ বিড়ালছানাকে ছোট বয়সেই ঘাড় ভেঙে হত্যা করা হতো, তারপর মমি বানিয়ে মানতের উপহার হিসেবে সমাধিস্থ করা হতো।
বিজ্ঞানের আধুনিক এক্স-রে মাইক্রো-সিটি স্ক্যানেও মাত্র পাঁচ মাস বয়সী মমি করা বিড়ালের ঘাড় ভাঙা হাড়ের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ মেরি-অ্যান পলসওয়েগনারের মতে, দেবতাকে সন্তুষ্ট রাখা বা তাঁদের সাহায্য প্রার্থনার জন্য বিড়াল কেনা ও উৎসর্গ করা সাধারণ মানুষের একটি প্রচলিত প্রথা ছিল।
শ্রদ্ধা, ধর্মীয় বিশ্বাস আর অন্ধ আসক্তির মাঝে যে কতটা সূক্ষ্ম ব্যবধান ছিল- মিসরীয়দের এই বিড়ালপ্রেমের ইতিহাস তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।