

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বঢাকার সাভারের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজার স্ত্রীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নেয়ামত উল্লাহর বিরুদ্ধে।
অডিও, ভিডিও, কল রেকর্ড ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে জানা গেছে, রাষ্ট্রপক্ষের তদন্তের গোপন নথি যদি পৌঁছে যায় আসামিপক্ষের হাতে। এছাড়া ঘুষ গ্রহণ, মামলার গোপনীয়তা ভঙ্গ, আলামত গোপন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আসামির স্ত্রীর সঙ্গে তদন্তের সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অভিযোগও উঠেছে।
জানা গেছে, গত ১০ জুন কক্সবাজার থেকে শামীম রেজাকে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। পরে রিমান্ডে নির্যাতন না করা, নতুন মামলায় নাম না জড়ানো এবং দ্রুত মুক্তির আশ্বাস দিয়ে এসআই নেয়ামত উল্লাহ ও এএসআই লিমনের জন্য দুটি আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে; যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। এর পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে ধাপে ধাপে আরও প্রায় তিন লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন শামীমের স্ত্রী সুমাইয়া সাথী।
আসামিপক্ষের হাতে নথি পৌঁছানো নিয়ে ফাঁস হওয়া একাধিক অডিও-ভিডিও ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে সংরক্ষিত থাকার কথা এমন সংবেদনশীল নথি, আলামত এবং মামলার অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত আসামির স্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে গিয়ে শামীম রেজার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়েও কথোপকথনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
একটি অডিওতে এসআই নেয়ামত উল্লাহকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তো স্যারদের সঙ্গে সর্বোচ্চটা চেষ্টা করতেছি, সে যেন অন্য কোনো মামলায় না পড়ে।’ আরেকটি রেকর্ডে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কোন কথাটা রাখি নাই? সব সময় খবর রেখেছি।’ এসব বক্তব্য তদন্ত কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া একাধিক কল রেকর্ডে দেখা যায়, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনের বাইরেও গভীর রাতে শামীমের স্ত্রীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেছেন এসআই নেয়ামত উল্লাহ। তাকে একান্তে দেখা করার অনুরোধ, সামনাসামনি ব্যক্তিগত কথা বলার আগ্রহ এবং ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার চাপ দেওয়ার বিষয়ও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে আরও অভিযোগ রয়েছে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বিশ্বাস অর্জনের লক্ষ্যে তিনি মসজিদে বসে পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে ভিডিও ধারণ করে তা শামীমের স্ত্রীর কাছে পাঠান এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
শামীম রেজার অটো গ্যারেজের চাবি ও জব্দকৃত মালামাল তদন্ত কর্মকর্তার হেফাজতে থাকা অবস্থায় ছয় দফায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার মালামাল চুরির অভিযোগও সামনে এসেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় এক বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতার অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও শুরুতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি অভিযোগকারীর। পরে জেলা পুলিশ পৃথক অভিযানে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কয়েকটি অটোরিকশা উদ্ধার করে।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে একই তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগকারীকে ওই ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে নতুন মামলা করতে চাপ দেন।
এ বিষয়ে শামীম রেজার স্ত্রী সুমাইয়া সাথী বলেন, স্বামীকে রিমান্ডে নির্যাতন না করা এবং নতুন মামলায় নাম না দেওয়ার কথা বলে আমাদের পরিবারের জমানো টাকা, স্বর্ণ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। দুটি আইফোনও দিতে বাধ্য হয়েছি।
গুরুতর এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মো. নেয়ামত উল্লাহ বিস্তারিত জানাবেন বলে সময় নিলেও পরে আর ফোনে সাড়া দেননি।
সাভার মডেল থানার নবনিযুক্ত ওসি সাইফুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। আগের ঘটনার বিস্তারিত জানা নেই। তবে কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধী বা মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আপস করতে পারেন না। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হরেকৃষ্ণ বলেন, পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা রাষ্ট্রপক্ষের গোপন তথ্য বা আলামত আসামিপক্ষের কাছে দিতে পারেন না। আসামির সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সুবিধা গ্রহণ কিংবা তদন্তের গোপনীয়তা নষ্ট করা গুরুতর বিভাগীয় অপরাধ।
গত ২২ মে মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই টেলিভিশন সাংবাদিক হামলার শিকার হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান আসামি শামীম রেজাকে ১০ জুন কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই মামলার তদন্ত ঘিরেই এবার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই উঠেছে ঘুস, গোপন নথি ফাঁস, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ।
সূত্র: যুগান্তর।