

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


টানটান উত্তেজনার ফুটবল ম্যাচ। গ্যালারিতে লাখো দর্শকের গর্জন। কোটি টাকার আধুনিক প্রযুক্তি আর নিখুঁত মাপে তৈরি চকচকে বুট পায়ে মাঠে নামছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার বা পেদ্রো নেতোর মতো বিশ্বসেরা তারকারা।
কিন্তু একটু ভালো করে খেয়াল করলেই দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য- ৩০০ পাউন্ড বা তার চেয়েও দামি সেই জুতোটার গোড়ালির দিকটা কাঁচি দিয়ে গোল করে কাটা! সেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে মোজা।
কোটিপতি ফুটবলারদের এই কাণ্ড দেখে অনেকেই ভাবেন এটা হয়তো নতুন কোনো ফ্যাশন বা ড্রেসিংরুমের রসিকতা। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে মাঠের বাইরের এক নির্মম ও যন্ত্রণাদায়ক সত্য।
ফুটবলারদের জুতো কেটে মাঠে নামার আসল কারণ ফ্যাশন নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একটি কঠিন শারীরিক সমস্যা, যার নাম 'হ্যাগলান্ডস ডিফরমিটি'। ১৯২৭ সালে সুইডিশ সার্জন প্যাট্রিক হ্যাগলান্ড প্রথম এই রোগটি শনাক্ত করেন।
সহজ কথায়, এটি হলো মানুষের গোড়ালির পেছনের হাড়ের এক ধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। আমাদের গোড়ালির যেখানে ‘অ্যাকিলিস টেন্ডন’ নামের প্রধান রগটি যুক্ত থাকে, সেখানে হাড় বেড়ে গিয়ে একটি উঁচু ঢিবির মতো তৈরি হয়।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এটি বড় কোনো সমস্যা না তৈরি করলেও, অ্যাথলেট বা ফুটবলারদের জন্য এটি রীতিমতো এক অভিশাপ।
ছবি সংগৃহীত
কেন এই তীব্র যন্ত্রণা?
ফুটবলারদের গতি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত আঁটসাঁট বা টাইট বুট পরতে হয়। এখন সমস্যা হলো, যখন একজন খেলোয়াড় এই টাইট বুট পরে মাঠে অনবরত দৌড়ান, তখন বুটের পেছনের শক্ত অংশটি গোড়ালির সেই বাড়তি হাড়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়।
গোড়ালির এই অংশে হাড় ও টেন্ডনের মাঝে 'বার্সা' নামের তরল পূর্ণ একটি ছোট থলি থাকে, যা কুশনের কাজ করে। অনবরত ঘর্ষণের ফলে সেই থলি ও টেন্ডন ফুলে যায় এবং তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়।
যত বেশি দৌড়ানো হয়, ব্যথা তত বাড়ে। এমনকি এই ঘর্ষণের ফলে সেখানে নতুন করে আরও হাড় গজাতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
অস্ত্রোপচার
বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো বড় বড় টুর্নামেন্টের মাঝে ফুটবলাররা তো আর সামান্য ব্যথার জন্য খেলা ছেড়ে দিতে পারেন না। আবার এই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হলো অস্ত্রোপচার করে বাড়তি হাড় কেটে ফেলা। কিন্তু এই সার্জারি অত্যন্ত জটিল।
অনেক সময় সার্জনদের মূল টেন্ডন কেটে আলাদা করে হাড় কাটতে হয় এবং পরে তা আবার জোড়া দিতে হয়। এই অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর ও যন্ত্রণাদায়ক। ব্রিটিশ
ক্রীড়া সাংবাদিক স্টুয়ার্ট জেমসের মতে, এই ব্যথা যেন গোড়ালির ওপর করাত চালানোর মতো!
তাই ক্যারিয়ারের দীর্ঘ বিরতি এড়াতে ফুটবলাররা অস্ত্রোপচারের চেয়ে বুটের পেছনে ছোট একটা ফুটো করে নেওয়াকেই সহজ সমাধান মনে করেন।
ছবি সংগৃহীত
বড় বড় নামী ক্লাবের চিকিৎসকেরা ফুটবলারদের পায়ের মাপে ঠিক ততটুকুই বুট কাটেন, যাতে জুতোটির ব্যালান্স নষ্ট না হয়, আবার বাড়তি হাড়টি ঘষা খাওয়া থেকেও বেঁচে যায়। ব্রাজিলের ফিলিপে কুতিনহো, রবার্তো ফিরমিনো কিংবা জার্মানির ম্যাটস হামেলসের মতো তারকারাও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে এই যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছেন।
কোটি ডলারের চুক্তি আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বুটের চেয়েও তখন খেলোয়াড়ের কাছে বুটের পেছনের ওই ছোট্ট ছিদ্রটিই হয়ে ওঠে মাঠের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।
তাই পরের বার টিভিতে কোনো ফুটবলারের ছেঁড়া বা কাটা বুট দেখলে বুঝবেন, এটি কোনো স্টাইল নয়, বরং দলের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে লড়ে যাওয়ার এক নীরব গল্প।
