

বর্তমান সমাজে মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্কদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ছে, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। এই বিষয়ে মাদকসেবী শনাক্তকরণ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ‘ডোপ টেস্ট’।
ডোপ টেস্ট হলো এমন একটি মেডিকেল পরীক্ষা, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি মাদক বা নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছেন কি না তা নির্ণয় করা হয়। নিয়মিত মাদক গ্রহণকারীদের শরীরে ওই নেশাজাতীয় পদার্থের কিছু উপাদান নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত থেকে যায়। রক্ত, মূত্র, মুখের লালা কিংবা চুলের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে এসব উপাদান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক গ্রহণের পর মুখের লালায় সাধারণত সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ পর্যন্ত, রক্তে প্রায় দুই মাস পর্যন্ত এবং চুলে এক বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত করা যেতে পারে। তবে মাদকের ধরন, ব্যবহারকারীর শারীরিক অবস্থা এবং সেবনের মাত্রার ওপর এই সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ছাড়াও বিভিন্ন প্রশাসনিক, আইনি এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে ডোপ টেস্ট করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, খেলাধুলায় নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবহার শনাক্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণ, ফরেনসিক তদন্ত এবং মাদকাসক্তি নিরাময় কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগদানের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে ডোপ টেস্টের রিপোর্ট চাওয়া হয়। একইভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স, অস্ত্রের লাইসেন্স, বিদেশে শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের আবেদন এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়াতেও ডোপ টেস্টের প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি) প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী ডোপ টেস্টে বেশ কয়েক ধরনের মাদক ও নেশাজাতীয় পদার্থ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াজেপাম, লোরাজেপাম, অক্সাজেপাম, টেমাজেপাম, কোডিন, মরফিন, হেরোইন, কোকেন, গাঁজা, ভাং, চরস, অ্যালকোহল, ফেনসিডিল, ইয়াবা এবং এলএসডি।
ডোপ টেস্টের শুরুতে পরীক্ষার্থীর পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এজন্য একটি নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হয়, যেখানে নাম, ঠিকানা, বয়স, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতে হয়।
পরবর্তীতে পরীক্ষার্থীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক বা অনুমোদিত মেডিকেল কর্মকর্তা নমুনা পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফলাফলে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া গেলে রিপোর্ট ‘পজিটিভ’ এবং মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়া গেলে ‘নেগেটিভ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ডোপ টেস্ট সাধারণত চারটি প্রধান পদ্ধতিতে করা হয়—
মূত্র পরীক্ষা (Urine Test): সবচেয়ে প্রচলিত এবং সহজ পদ্ধতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদক শনাক্তে এটি ব্যবহার করা হয়।
মুখের লালা পরীক্ষা (Saliva Test): সাম্প্রতিক সময়ে মাদক গ্রহণ করা হয়েছে কি না তা দ্রুত শনাক্ত করতে কার্যকর।
রক্ত পরীক্ষা (Blood Test): শরীরে মাদকের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায়।
চুল পরীক্ষা (Hair Test): দীর্ঘমেয়াদে মাদক গ্রহণের ইতিহাস জানতে চুল পরীক্ষা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ৯০ দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত আগের মাদক গ্রহণের তথ্য এতে পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ সন্দেহভাজন চালকদের ক্ষেত্রে অ্যালকোহল ডিটেক্টর বা নিঃশ্বাস পরীক্ষার মাধ্যমে মাদক ও অ্যালকোহলের উপস্থিতি শনাক্ত করে থাকে।
মাদকের ধরন ও ব্যবহারের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে শনাক্তযোগ্য সময়সীমা ভিন্ন হয়। সাধারণত গাঁজা ৩ থেকে ৭ দিন, নিয়মিত সেবনে ৩০ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়।
ইয়াবা ১ থেকে ৩ দিন, নিয়মিত সেবনে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত শনাক্তযোগ্য থাকে। হেরোইন সাধারণত ১ থেকে ৩ দিন, কোকেন ২ থেকে ৪ দিন এবং এক্সট্যাসি ১ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত শরীরে শনাক্ত করা যায়।
অন্যদিকে এলএসডি সাধারণত ১ থেকে ৩ দিন, অ্যালকোহল ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টা এবং মেথাডোন ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত শরীরে থাকতে পারে। নিয়মিত সেবনের ক্ষেত্রে এসব সময়সীমা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালে ডোপ টেস্টের সুবিধা রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ডোপ টেস্টের সর্বোচ্চ ফি নির্ধারণ করেছে ৯০০ টাকা। বিভিন্ন ধরনের মাদক পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে অধিকাংশ পরীক্ষার ফি ১৫০ টাকা এবং অ্যালকোহল পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা।
রাজধানীর অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে স্থাপিত মিনিল্যাবের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
মাদকাসক্তি প্রতিরোধ এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে ডোপ টেস্ট বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এর ব্যবহার বাড়ার ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।