

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


'নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স' বা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় এক রহস্য। যখন কোনো মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় বা কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে শরীর সাময়িকভাবে
'ক্লিনিক্যালি ডেড' হয়ে পড়ে, তখনো অনেকে অলৌকিক কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফিরে আসেন।
বিজ্ঞান এবং নিউরোলজি (স্নায়ুবিজ্ঞান) এই রহস্যময় অভিজ্ঞতাগুলোকে কোনো অলৌকিক ঘটনা মনে করে না, বরং এটিকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মস্তিষ্কের শেষ মুহূর্তের এক জটিল মেকানিজম বা টিকে থাকার লড়াই হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক আসা
অনেকেই বলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখের সামনে সেকেন্ডের মধ্যে পুরো জীবনের সব স্মৃতি বা প্রধান প্রধান ঘটনাগুলো সিনেমার মতো ভেসে ওঠে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় "লাইফ রিভিউ"
আমাদের স্মৃতির ভাণ্ডার জমা থাকে মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোব) এবং হিপোক্যাম্পাস অংশে। তীব্র সংকটের মুহূর্তে বা অক্সিজেনের অভাবে যখন এই অংশগুলো নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে, তখন মস্তিষ্কে এক ধরণের 'বৈদ্যুতিক ঝড়' বা হাইপার-অ্যাক্টিভিটি তৈরি হয়।
মৃত্যুর ঠিক আগে মস্তিষ্কের কিছু অংশ প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে পুরনো সব স্মৃতি একসঙ্গে সচেতন মনে চলে আসে। মানুষ তখন সময়ের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে, তাই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো জীবনটা এক ঝলকে দেখা সম্ভব হয়।
মানুষ আসলে কী দেখতে পায়?
নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্সের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষদের অভিজ্ঞতায় কয়েকটি সাধারণ মিল পাওয়া যায়: একটি অন্ধকার টানেল এবং শেষে আলো
সবচেয়ে চেনা অভিজ্ঞতা হলো একটি অন্ধকার সুড়ঙ্গ বা টানেল দিয়ে ছুটে যাওয়া এবং তার শেষে একটি তীব্র, কিন্তু প্রশান্তিময় আলো দেখা।
মৃত্যুর সময় হৃদপিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়, তখন চোখ এবং মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স (Visual Cortex - যা আমাদের দেখতে সাহায্য করে) অংশে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ দ্রুত কমতে থাকে। এর ফলে আমাদের 'পেরিফেরাল ভিশন' বা চারপাশের দৃষ্টিশক্তি প্রথমে নষ্ট হয়ে যায় এবং শুধু কেন্দ্রের দৃষ্টিটুকু বাকি থাকে।
একে বলা হয় টানেল ভিশন (Tunnel Vision)। চারপাশ অন্ধকার হয়ে শুধু মাঝখানে আলো দেখার এই শারীরিক অনুভূতিটাকেই মানুষ টানেলের শেষের আলো হিসেবে ভুল করে।
নিজের শরীরকে উপর থেকে দেখা
অনেকে দাবি করেন, তারা নিজের শরীর ছেড়ে উপরে উঠে গেছেন এবং ডাক্তাররা যে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, তা উপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।
আমাদের মস্তিষ্কের টেম্পোরো-প্যারাইটাল জাংশন নামের অংশটি আমাদের শরীরের অবস্থান বুঝতে এবং চারপাশের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে সাহায্য করে।
অক্সিজেনের অভাব ঘটলে বা এই অংশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে ব্রেন নিজের শরীরের সীমানা গুলিয়ে ফেলে। ফলে হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম তৈরি হয়, যার কারণে মনে হয় চেতনা শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে।
অনেক রোগী জানান, তারা কোনো স্বর্গীয় অনুভূতি, তীব্র আনন্দ এবং তাদের আগে মারা যাওয়া কোনো প্রিয়জনকে দেখতে পেয়েছেন।
শরীর যখন চরম ট্রমা বা কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক নিজেকে শান্ত করার জন্য এবং ব্যথা কমানোর জন্য প্রাকৃতিকভাবে এন্ডোরফিন এবং ডোপামিন এর মতো 'ফিল-গুড' হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের বন্যা বইয়ে দেয়।
একই সাথে কেটামিন বা ডিএমটি এর মতো প্রাকৃতিক কেমিক্যালের ক্ষরণ হতে পারে। এর ফলে এক ধরণের তীব্র ভালো লাগার সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে হ্যালুসিনেশনের মাধ্যমে মৃত স্বজনদের অবয়ব দেখায়।
মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে আমাদের হৃদপিণ্ড বন্ধ হলেও, মস্তিষ্ক কিন্তু সাথে সাথে মরে যায় না। অক্সিজেনের অভাবে মরতে বসা বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন বা মস্তিস্কের কোষগুলো শেষবারের মতো একসাথে তীব্র বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে।
এই শেষ মুহূর্তের "মস্তিষ্কের আতশবাজিই" হলো নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স- যা মানুষকে এক অদ্ভুত, পরাবাস্তব কিন্তু প্রশান্তিময় অভিজ্ঞতার অনুভূতি দেয়।
