

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২০টি সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনা ঘটে। আধুনিক দালানকোঠার একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও, সেপটিক ট্যাংকের নির্মাণশৈলী ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সবচেয়ে অবহেলিত থাকে।
সঠিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এই ট্যাংকে জমে থাকা বর্জ্য একসময় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়। মূলত অসচেতনতা এবং সঠিক প্রযুক্তির অভাবই এই অকাল প্রাণহানির প্রধান কারণ।
দুর্ঘটনার মূল কারণ-
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে না। ফলে সেখানে মলমূত্র ও অন্যান্য বর্জ্য পচে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যে নেমে আসে এবং বিভিন্ন মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়:
হাইড্রোজেন সালফাইড: এটি পচা ডিমের মতো গন্ধযুক্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি গ্যাস। এর উচ্চ ঘনত্ব মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে তাৎক্ষণিকভাবে অবশ করে দেয় এবং শ্বাসযন্ত্র নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।
অ্যামোনিয়া ও মিথেন: এই গ্যাসগুলো ট্যাংকের ভেতরের বাতাস থেকে অক্সিজেন সম্পূর্ণ তাড়িয়ে দেয়। ফলে ভেতরে নামামাত্র মানুষ দম বন্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কার্বন মনোক্সাইড: এটি একটি বর্ণহীন ও গন্ধহীন বিষাক্ত গ্যাস, যা শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে দ্রুত অজ্ঞান করে ফেলে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ট্যাংকে নামা কোনো ব্যক্তির সাড়াশব্দ না পেয়ে তাকে বাঁচাতে অন্য কেউ ভেতরে নামেন এবং তিনিও একই দুর্ঘটনার শিকার হন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া সেপটিক ট্যাংকে নামলে যে কারও মৃত্যু অনিবার্য।
মৃত্যু এড়ানোর কার্যকর উপায়-
বাংলাদেশ রসায়ন সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যেই মানুষের দ্বারা (ম্যানুয়ালি) সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তবে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে সুরক্ষার জন্য নিচের সহজ ও নিরাপদ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:
১. বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা: ট্যাংক পরিষ্কার বা মেরামতের অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে এর ঢাকনা খুলে রাখতে হবে, যেন ভেতরের বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচল করতে পারে।
২. অক্সিজেন পরীক্ষা: ট্যাংকে নামার আগে একটি জ্বলন্ত হারিকেন বা কুপি দড়ি দিয়ে বেঁধে ভেতরে নামাতে হবে। যদি বাতিটি দ্রুত নিভে যায়, তবে বুঝতে হবে সেখানে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
৩. গাছের ডালপালা ব্যবহার: অক্সিজেন মাস্ক না থাকলে, অনেক পাতাসহ একটি গাছের ডাল দড়িতে বেঁধে ট্যাংকের ভেতর বারবার ওঠানামা করালে বিষাক্ত গ্যাস বাইরে বেরিয়ে আসে এবং কিছুটা অক্সিজেন ভেতরে প্রবেশ করে।
৪. সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার: বদ্ধ যেকোনো কূপ বা গর্তে ঢোকার সময় 'অক্সিজেন মাস্ক' ও সেফটি বেল্ট ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
৫. পেশাদার সাহায্য নেওয়া: কোনো ব্যক্তি বা প্রাণী অসাবধানতাবশত ট্যাংকে পড়ে গেলে নিজে সরাসরি না নেমে অবিলম্বে ফায়ার সার্ভিস বা পেশাদার উদ্ধারকারীর সাহায্য নিতে হবে।
সচেতনতাই পারে এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করতে। যেকোনো ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সেপটিক ট্যাংকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।
