রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ৬ হাজার রুপির জন্য খুন হয়েছিলেন অভিনেত্রী!

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির একটি ফ্ল্যাট থেকে ২০১৭ সালে অভিনেত্রী কৃত্তিকা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময় অভিনেত্রীর মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকমের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও পুলিশ একে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই উল্লেখ করে। এ হত্যাকাণ্ডের ৯ বছর পর এবার বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, মাত্র ৬ হাজার রুপির জন্য খুন করা হয়েছিল এই অভিনেত্রীকে। তবে পরিবারের কাছে এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। কারণ, কৃত্তিকার ফ্ল্যাট থেকে ২২ হাজার রুপি নগদ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। তাহলে এত সামান্য টাকার জন্য কেন তাকে খুন করা হবে—এই প্রশ্ন তুলেছিলেন তার ভাই।

ঘটনাটি ২০১৭ সালের ১২ জুনের। মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টের শ্রী ভৈরবনাথ এসআরএ সোসাইটির ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে কৃত্তিকার পচন ধরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

সেদিন বিকেলে ফ্ল্যাট থেকে পচা গন্ধ পেয়ে পুলিশকে খবর দেন প্রতিবেশীরা। পুলিশ গিয়ে দেখে, বাইরে থেকে দরজায় তালা দেওয়া। অথচ ভেতরে টেলিভিশন ও এসি চলছিল।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে বিছানার ওপর তার মরদেহ পাওয়া যায়। পরনে ছিল নাইটগাউন। মাথায় ছিল গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। পাশে পড়ে ছিল রক্তমাখা একটি ব্রাস নাকল। ফ্ল্যাটের ভেতর সাদা রঙের কিছু গুঁড়াও পাওয়া যায়, যেগুলো মাদক বলে সন্দেহ করেছিল পুলিশ।

কৃত্তিকার সঙ্গে পরিবারের শেষ যোগাযোগ হয়েছিল মৃত্যুর কয়েক দিন আগে। তার ভাই দীপক চৌধুরীর সঙ্গে ৮ জুন শেষ কথা হয়। এরপর আর ফোন ধরেননি তিনি।

এর মধ্যে এক পুরোনো বন্ধু জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাকে খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেই বার্তারও কোনো উত্তর আসেনি।

ময়নাতদন্তে জানা যায়, মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণেই কৃত্তিকার মৃত্যু হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, তার মাথায় তিনবার আঘাত করা হয়েছিল।

হত্যার পর ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টেলিভিশন ও এসি চালু রাখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, সন্দেহ এড়াতে এবং মরদেহ পচতে কিছুটা সময় বেশি লাগানোর উদ্দেশ্যেই এমনটা করা হয়েছিল।

সিসিটিভিতে দুই ব্যক্তি

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আসে ফ্ল্যাটের ভেতর পাওয়া একটি রক্তমাখা পুরুষের শার্ট থেকে। এরপর ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে পুলিশ দেখতে পায়, কৃত্তিকাকে হত্যার সময়ের কাছাকাছি দুজন অপরিচিত ব্যক্তি তার ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।

কৃত্তিকার ভাই আরও জানান, তার কিছু গয়না ও দামি জিনিসপত্রও পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে শার্টটির মালিককে শনাক্ত করতে পুলিশ বিভিন্ন ব্যক্তি ও দোকানির সঙ্গে কথা বলে। পাশাপাশি শার্ট থেকে পাওয়া ডিএনএও তদন্তে ব্যবহার করা হয়।

পরে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পানভেল থেকে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা হলেন শাকিল নাসিম ও বাসুদেব। পুলিশ তাদের খুঁজছে জানতে পেরে তারা জায়গা বদল করে প্রথমে মালওয়ানি ও পরে পানভেলে আত্মগোপন করেছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানান।

পাওনা ছিল ৬ হাজার রুপি

গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানায়, নাসিম মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রায় এক বছর আগে তিনি কৃত্তিকাকে মাদক সরবরাহ করেছিলেন। সেই বাবদ তার ৬ হাজার রুপি পাওনা ছিল।

পুলিশের দাবি, কৃত্তিকা টাকা পরিশোধে বারবার সময় নিচ্ছিলেন। এদিকে অন্য একটি মাদক ও গাড়ি চুরির মামলায় নাসিম কারাগারে ছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর তার টাকার প্রয়োজন হয়। তখন কৃত্তিকার কাছে পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টা শুরু করেন তিনি।

সরাসরি কৃত্তিকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে পরিচিতদের মাধ্যমে তার ঠিকানা সংগ্রহ করেন নাসিম। প্রথমবার দেখা করতে গিয়ে টাকা না পেয়ে ফিরে যান। পরে আবার গেলে কৃত্তিকা টাকা দেওয়ার সময় আরও পিছিয়ে দেন বলে তদন্তে উঠে আসে।

খাবারের পর শুরু হয় ঝগড়া

পুলিশের দাবি, ৮ জুন নাসিম বাসুদেবকে সঙ্গে নিয়ে কৃত্তিকার ফ্ল্যাটে যান। শুরুতে তিনজনের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়। এমনকি তারা একসঙ্গে রাতের খাবারও খান। পরে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশের অভিযোগ, নাসিম সঙ্গে করে একটি ব্রাস নাকল নিয়ে গিয়েছিলেন। সেটি দিয়েই কৃত্তিকার মাথায় আঘাত করা হয়।

তদন্তকারীরা বলেন, কৃত্তিকার রক্তে নাসিমের শার্ট ভিজে গেলে তিনি সেটি খুলে ফ্ল্যাটে রেখে যান। সঙ্গে থাকা বাড়তি পোশাক পরে নেন তিনি। এরপর দুজন টেলিভিশন ও এসি চালু রেখে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে চলে যান।

পরিবারের সন্দেহ থেকেই যায়

পুলিশের এই তদন্তের সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিল না কৃত্তিকার পরিবার। বিশেষ করে ৬ হাজার রুপির বিষয়টি নিয়ে তাদের প্রশ্ন ছিল।

কৃত্তিকার ভাই দীপকের যুক্তি ছিল, তার বোনের কাছে ৬ হাজার রুপির চেয়েও বেশি অর্থ থাকার কথা। পুলিশও ফ্ল্যাট থেকে ২২ হাজার রুপি নগদ উদ্ধার করেছিল। তাহলে ওই টাকা পরিশোধ না করার জন্যই কেন তাকে হত্যা করা হবে?

উল্লেখ্য, ‘পরিচয়’ ও ‘সাবধান ইন্ডিয়া’র মতো টেলিভিশন অনুষ্ঠানে কাজ করেন তিনি। বালাজির কয়েকটি প্রযোজনাতেও ছিলেন। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাজ্জো’ ছবিতে কঙ্গনা রনৌতের বোনের চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন।

তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তদন্তের সময় নানা তথ্য সামনে আসে। এক পুরোনো বন্ধুর দাবি ছিল, কৃত্তিকা মাদকাসক্ত ছিলেন এবং অতীতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এসব ছিল ওই বন্ধুর বক্তব্য; হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়েছিল কি না, তা আলাদা বিষয়।

কৃত্তিকার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তার সাবেক স্বামী বিজয় দ্বিবেদীও যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি সম্পর্ক পুনরায় শুরু করতে চেয়েছিলেন বলে খবর ছিল। কৃত্তিকা তাতে রাজি হননি। অন্য একটি মামলায় বিজয় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও পরে তদন্তের কেন্দ্র চলে যায় নাসিম ও বাসুদেবের দিকে।

শেষ পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তমাখা শার্ট ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তে ৬ হাজার রুপির দেনার কথাই হত্যার কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়। তবে পরিবারের প্রশ্ন ছিল, ফ্ল্যাটে নগদ টাকা থাকা সত্ত্বেও এত সামান্য অর্থের জন্যই কি কৃত্তিকাকে হত্যা করা হয়েছিল? সেই প্রশ্নই অভিনেত্রীর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সংশয়গুলোর একটি হয়ে ছিল।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন