

টানা ভারী বৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। রোববার (১২ জুলাই) সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক আবাসিক হল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানি জমে যায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় কয়েক হাজার আবাসিক শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ক্লাব, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, ভিসি চত্বর, গণিত ভবন, কার্জন হল, নীলক্ষেত এলাকা, পলাশীর মোড়, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
নিউমার্কেট সংলগ্ন বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সামনে কোথাও কোমরসমান, কোথাও গলাসমান পানি জমে থাকতে দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে দুই হলের বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের পাশাপাশি সুপেয় পানি ও খাবারের সংকটেও পড়েছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আনিকা তামজিদ বলেন, এত পানি জমেছে যে হলের কোনো শিক্ষার্থীই বের হতে পারছেন না। সকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই, খাওয়ার পানিও প্রায় শেষ হওয়ার উপক্রম। সন্ধ্যায় আলো জ্বালানোরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতার মধ্যেও পরীক্ষা পেছানো হয়নি। কষ্ট করে পানির মধ্যে গিয়েই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ডিভাইসে পড়াশোনাও করা সম্ভব হয়নি।
কুয়েত মৈত্রী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাসলিমা জান্নাত বলেন, সকাল থেকে ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ক্লাসে যেতে পুরো ভিজে যেতে হয়েছে। যাদের পরীক্ষা ছিল, তাদের অবস্থা আরও দুর্বিষহ।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) তাসনিম আক্তার আলিফ নাবিলা বলেন, সকাল থেকেই বিদ্যুৎ নেই। মোবাইলের চার্জও শেষের দিকে। আবার বৃষ্টি হলে নিচতলার কক্ষগুলোতেও পানি উঠে যেতে পারে।
একই হলের শিক্ষার্থী ফারজানা রহমান নদী বলেন, পুরো হল জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। হলের দোকানগুলো বন্ধ থাকায় খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। হল থেকে বের হওয়ারও কোনো উপায় নেই।
মাস্টারদা সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আজগারুল ইসলাম বলেন, অতিবৃষ্টিতে সকালে আমাদের হলেও পানি জমে গিয়েছিল। তবে এখন আর নেই। হলের একমাত্র বৃহৎ আমলকি গাছটিও উপড়ে গেছে।
এদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। শহীদুল্লাহ হলের নিচতলার বারান্দায় পানি উঠে যায়।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জুনায়েদ আবরার বলেন, হলের মাঠে বুকসমান পানি উঠে গেছে। আরও কিছুক্ষণ বৃষ্টি হলে নিচতলার কক্ষগুলোতেও পানি ঢুকে পড়বে।
জলাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বাংলা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, গণিত ও বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের নির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।
এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে একটি বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজা খাতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ফজিলাতুন্নেছা হল, মৈত্রী হল ও সমাজকল্যাণ অনুষদের পানির সমস্যা সমাধানে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। প্রতি বছর একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবা সুলতানা বলেন, হলের পানি কিছুটা কমেছে, তবে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। পানি পুরোপুরি না সরলে বিদ্যুৎ দিলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। খাওয়ার পানির সমস্যাও অনেকটা সমাধান করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পানির সমস্যা অনেকটা সমাধান হয়েছে, তবে বিদ্যুতের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর যে দাবি জানিয়েছেন, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, টানা বৃষ্টি হলেই এই দুটি হল পানিতে তলিয়ে যায়। এর স্থায়ী সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আমরা দ্রুত হলগুলো পরিদর্শনে যাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমি দেশে ফিরেছি। খুব শিগগিরই ক্ষতিগ্রস্ত হলগুলো পরিদর্শনে যাব। হলগুলোতে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং খাবারের সংকট আছে কি না, তা প্রশাসন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে জরুরি কিছু উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানান, কুয়েত মৈত্রী হল ও ফজিলাতুন্নেছা হলের সামনে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য চারটি ভ্যান সরবরাহ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনের বাসের ট্রিপও বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে আবাসিক হলগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ, মোমবাতি, সুপেয় পানি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ওয়াসার সহযোগিতায় দুই গাড়ি পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্টেট অফিস ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ডাকসু।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, প্রতি বছর একই ধরনের জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি রোধে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য আমরা একাধিক প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে ডাকসুর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
টানা বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সেবার ব্যাঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ দাবি করছেন।