বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রভাবশালীদের দখলে জবির ১২ আবাসিক হল, সমাধান কোথায়?

হাসিব সর্দার, জবি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ০৯:০২ পিএম
এনপিবি কোলাজ
expand
এনপিবি কোলাজ
  • রাজনৈতিক শক্তির কারণে দখলদারিত্বের সমীকরণ বদলায়নি
  • বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ও দৃঢ় সদিচ্ছার অভাব
  • জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে মালিকানার দাবি
  • মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার অভাব

চার দশক পরেও প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ টি আবাসিক হল। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, প্রশাসনের উদ্যোগ ও সরকারি কমিটি গঠন হলেও অধিকাংশ হল আজও ২টি হল ছাড়া অন্যগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে আবাসন সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। যে দুটি হল উদ্ধার করে কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করছে সেগুলোর কাজও ধীরগতিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ অনুযায়ী বিলুপ্ত জগন্নাথ কলেজের সব সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি যাচাইয়ে ‘মুসিহ মুহিত’ অডিট ফার্মকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর একে একে হলগুলো বেদখলে চলে যায়। এরপর ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি হলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করা হলে বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। পরে একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক মাসের মধ্যে হল উদ্ধারে সুপারিশ দিতে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি পরবর্তীতে পাঁচটি হল বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার সুপারিশ করলেও আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় উদ্ধার কার্যক্রম থেমে যায়।

আবদুর রহমান হল: আরমানিটোলা বটতলার ৬, এসি রায় রোডের এই হলটিতে বর্তমানে পুলিশ সদস্যদের পরিবার বসবাস করছে। জানা যায়, ঢাকা আঞ্জুমান সংস্থা হলটির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেছিল। যদিও মূল মালিক ছিলেন চিন্ময়ী দেবী।

১৯৬৫ সালে এটি অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পরে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে বসবাস শুরু করেন। ১৯৮৫ সালের সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা হল ছাড়লে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের পরিবার সেখানে বসবাস শুরু করে। এখনো মূল ফটকে হলের সাইনবোর্ড রয়েছে এবং অবকাঠামো অক্ষত আছে।

শহীদ আনোয়ার শফিক হল: আরমানিটোলার মাহুতটুলির শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী রোডের প্রায় ৪০ কাঠার এই হল স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। পুরোনো ভবন ভেঙে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে টিন, হার্ডওয়্যার ও ফার্নিচারের গোডাউন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব স্থাপনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ১৯৮৫ সালের সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা হলটি ছাড়তে বাধ্য হন।

তিব্বত হল: ওয়াইজঘাট এলাকার জিএল পার্থ লেনের এই হলটির জায়গায় বর্তমানে ‘গুলশান আরা সিটি মার্কেট’ নির্মিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, হাজী সেলিম ২০০১ সালে তার স্ত্রীর নামে মার্কেট নির্মাণ শুরু করেন। এ নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করলেও হলটি উদ্ধার করা যায়নি। ২০১১ সাল পর্যন্ত ভবনে ‘তিব্বত হল’ লেখা সাইনবোর্ড ছিল।

সাইদুর রহমান হল: টিপু সুলতান রোডের যদুনাথ বসাক লেনের এই হলটি বর্তমানে হার্ডওয়্যারের দোকানে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দানকৃত সম্পত্তিটি জাল দলিলের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

রউফ মজুমদার হল: সাইদুর রহমান হলের পাশের এই হলটিরও অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় ভূমিদস্যুরা জাল দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহীদ আজমল হোসেন হল: পাটুয়াটুলীর রমাকান্ত নন্দী লেনের এই হলটিতে একসময় পুলিশ সদস্যদের পরিবার বসবাস করত। কিছু অংশে বিভিন্ন সমিতিও গড়ে ওঠে। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা হলটির বিভিন্ন অংশ দখলে নেয়। ২০১১ সালে সেখানে ‘বেগম রোকেয়া (শহীদ পরিবার)’ সাইনবোর্ড টানিয়ে দখলের অভিযোগ ওঠে। তবে এখনো হলটির অবকাঠামো অক্ষত রয়েছে।

বজলুর রহমান হল: বংশালের মালিটোলার এই হলটিতে বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-এর উদ্যোগে একটি বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া কিছু অংশ স্থানীয় ভূমিদস্যুদের দখলে রয়েছে। ১৯৮৫ সালের সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা হলটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

বাণী ভবন: ঈশ্বরচন্দ্র দাস লেনের এই ভবনের একাংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী বসবাস করলেও দুই-তৃতীয়াংশ এখনো বেদখলে রয়েছে। স্থানীয়দের দাপটে সেখানে থাকা কর্মচারীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে।

নজরুল ইসলাম হল: গোপীমোহন বসাক লেনের প্রায় ২০ কাঠার এই হলের জায়গায় বর্তমানে একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া একাংশে ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

শহীদ শাহাবুদ্দিন হল: তাঁতীবাজারের এই হলটি দীর্ঘদিন পুলিশের দখলে ছিল। পরে ২০০৯ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এটি দখলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কর্মচারী আবাস: পাটুয়াটুলীর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসস্থলের জায়গায় বর্তমানে বহুতল মার্কেট নির্মিত হয়েছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি এর মালিকানা দাবি করছেন বলে জানা যায়।

এদিকে আবাসিক হল না থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় অংশকে উচ্চ ভাড়ায় মেস বা বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে আর্থিক চাপ, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা।

হল উদ্ধার প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেছিলেন, “আইন অনুযায়ী তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের সব সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পেলে হল উদ্ধারে অগ্রগতি সম্ভব।”

তবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কেন এখনো উদ্ধার হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেদখল হওয়া হলগুলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দীন বলেন, ‘বেদখল হলগুলোর প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে আমরা রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র চেয়েছি। গত ৩-৪ দিন আগে এ বিষয়ে পাঠানো হয়েছে, আজকের মধ্যেই সেগুলো হাতে আসতে পারে। সম্ভব হলে ঈদের আগেই আমরা হলগুলো পরিদর্শনে যাবো। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আমি সেই কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমরা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে হলগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করবো। সরকার থেকেও একটি হল লিজের বিষয়ে আমাদের কাছে চিঠি এসেছে। আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা আশাবাদী, শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক কিছু করা সম্ভব হবে।’

জকসুর ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘উপাচার্য স্যার হল উদ্ধারের বিষয়ে একটি সভা করে নিজেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তবে এক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি যে কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছিলেন, এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতিগুলোরও বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি আমাদের হতাশ করছে। আমরা আশা করি, উপাচার্য স্যার দ্রুত তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে এ সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।’

এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আরেফিন বলেন, ‘এখন আওয়ামী লীগ না থাকলেও গত ১৮ মাস জামায়াতপন্থী ভিসি ছিলেন যার জন্য উনি অদক্ষতার সর্বোচ্চ পরিচয় দিয়েছেন। এখন আইন মেনে সুন্দরভাবে চেষ্টা চলছে এবং যথাসাধ্য কাজ করা হচ্ছে।’

শাখা ছাত্র শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সত্ত্বেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো উদ্ধার না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ও দৃঢ় সদিচ্ছার অভাব। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বা নতুন রাজনৈতিক শক্তির কারণে দখলদারিত্বের সমীকরণ বদলায়নি। একথায়, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং প্রশাসনের জোরালো পদক্ষেপ ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক হলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে এবং সবগুলো পুনরুদ্ধার করা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। তিনি জানান, বিভিন্ন স্থানে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে মালিকানা দাবি কিংবা আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। তবুও আইনগতভাবে যতটুকু সম্ভব সম্পদ উদ্ধার এবং নতুন আবাসিক সুবিধা তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। চলমান প্রকল্পগুলোর জটিলতা নিরসন করে নতুন হল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়েই প্রশাসন ধাপে ধাপে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’

এ বিষয়ে ঢাকা জেলার নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমকে কয়েকবার মুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সম্ভব হয়নি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন