শনিবার
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে জোর দিচ্ছে সরকার: তিতুমীর

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম
কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি: সংগৃহীত
expand

ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় সরকার। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিরুলিয়া ক্যাম্পাসে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। ‘কানেক্টিং নলেজ, পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ফর বেটার গভর্ন্যান্স’ শীর্ষক এ আয়োজনে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবীরা অংশ নেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের সংকটের কারণে জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যে ছেয়ে গেছে। জ্বালানি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তাই বৈষম্য কমানো, সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা এবং সবার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি।

তিতুমীর বলেন, শাসকরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন, এতে নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয়েছে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। শাসনব্যবস্থার সঙ্গে মূলত তিনটি বিষয় জড়িত, ক্ষমতা, নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ ফলাফল পাওয়া গেলেও তা সামাজিকভাবে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত নাও করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে এই অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠান মানে শুধু আইন, বিধি বা সাংগঠনিক কাঠামো নয়; এর সঙ্গে রীতি-রেওয়াজ ও মূল্যবোধও জড়িত। তাই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান নিয়েই গবেষণা প্রয়োজন। অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা করতে হবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা এবং সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ তৈরি হয়।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলেও সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটি কার জন্য, কে আইন তৈরি করছে, আইনের ফলে কারা লাভবান হচ্ছে এবং পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, গভর্ন্যান্সের ধারণা নতুন নয়। আকবরের আমলের ‘আইন-ই-আকবরী’, কনফুসিয়াস, নিজামুল মুলক, তিরুভল্লুভর ও ইবনে খালদুনের লেখায় সুশাসনের বিভিন্ন দিক পাওয়া যায়। তবে ভালো শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রশাসন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই শাসনব্যবস্থার সমস্যা রয়েছে। শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন আস্থা, ন্যায়নীতি ও জবাবদিহি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থা ও অলিগার্কি থাকলে ভালো শাসন নিশ্চিত করা কঠিন। তাই ‘গুড গভর্ন্যান্স’-এর পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ‘গুড এনাফ গভর্ন্যান্স’-এর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিজিএসের পরিচালক আব্দুল বাকি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে পরিবর্তন চলছে, তা ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু সুশাসনের কথা বললেই হবে না, বাস্তবে কী ঘটছে জনগণ তা দেখতে ও বুঝতে চায়।

তিনি বলেন, গণতন্ত্র, সামাজিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক এবং জননীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে ব্যবধান রয়েছে, তা কমানো জরুরি। অনেক সময় বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে তা থেমে যায়। জ্ঞান, নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে এই ব্যবধান কমানোই সিজিএসের অন্যতম লক্ষ্য।

আব্দুল বাকি জানান, গবেষণা, নীতি সংলাপ, সক্ষমতা উন্নয়ন, পেশাগত শিক্ষা ও সামাজিক উদ্ভাবন ল্যাবের মাধ্যমে নীতিকে বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, তা পরীক্ষা করা হবে। বাংলাদেশের বিষয়গুলো শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়েও দেখা হবে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করাই সিজিএসের অন্যতম লক্ষ্য।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির বলেন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক প্রভাব তৈরির যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষা দেওয়া নয়; জ্ঞান সৃষ্টি, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব তৈরি এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবদান রাখাও এর দায়িত্ব।

তিনি বলেন, কার্যকর সুশাসনের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রমাণভিত্তিক জননীতি প্রয়োজন। সিজিএস গবেষণা, নীতি সংলাপ ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে গবেষক, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়নকর্মীদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনবে। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিল্প ও জননীতির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রমাণভিত্তিক সংস্কার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কেন্দ্রটি ভূমিকা রাখবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank