

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আমাদের চলমান এই যান্ত্রিক জীবনকে এক চিলতে প্রশান্তি দিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যই একমাত্র ভরসা। কারণ প্রকৃতি জীবনকে গতিশীল করে, মনকে প্রশান্ত করে। তাই সামান্য সুযোগ পেলেই মানসিক প্রশান্তি পেতে কখনো ছুটে চলি বিলঝিলে, অথবা গহীন অরণ্যে।
কখনো আবার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে। একটু অবসর পেলেই ছুটে চলি প্রকৃতির সুনিপুন রূপমাধুর্য অবলোকন করতে। খুব কাছ থেকে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে ভীষণ ভালোবাসি।
তাই গত বুধবার ফটোগ্রাফি করতে গিয়েছিলাম টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। উপজেলার ধলাপাড়া ইউনিয়নের পদ্মকুড়িবিল এবং কাইলান বিলের কাছে যেতেই চোখে পরে বুনো হাঁসের একটি দল। উড়ন্ত হাঁসের দলটি অনুসরণ করে বিলের আরো কাছে যেতেই লক্ষ্য করি শত শত বুনো হাঁসের দল জলাশয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
পাখিদের ডানা ঝাপটানো এবং কিচিরমিচির শব্দে দারুন এক দৃশ্য অবলোকন করলাম। দ্রুত ক্যামেরা বের করে সাটার স্প্রিট আর জুমিং ঠিক করে হাঁসের স্থিরচিত্র সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পরেছিলাম। এই হাঁসগুলো প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত প্রায়। দেহের গড়ন ও আকৃতি অনুযায়ী পাখিটি পাতি সরালি হাঁস ((Lesser Whistling Duck) হাঁস নামে পরিচিত।
এই সরালি হাঁসটি আমাদের প্রকৃতির আবাসিক জলচর পাখি। এরা আমাদের প্রকৃতিতেই জন্মগ্রহণ করে। প্রকৃতির সুরক্ষায় সব পাখির মতো এরাও নিরবে অবদান রেখে চলেছে। ছোট-বড় জলাভূমিতে ডানা ঝাপটিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই পাখিটিকে মানুষ এখনো চিনে উঠতে পারেনি ঠিক মতো।
তাই পরিযায়ী পাখি হিসেবে ‘পাতি সরালি হাঁস বিভিন্ন জায়গায় ভুল উপস্থাপন করা হয়। এতে সাধারণ পাঠক-পাঠিকরা বিভ্রান্তের মাঝে পড়েন। সরালি হাঁস কখনোই পরিযায়ী পাখি নয়, এরা দেশীয় পাখি।
বিলের জলে ওরা যখন একত্রিত হয়ে বিশ্রাম গ্রহণ করে অথবা খাদ্য অনুসন্ধানে সময় ব্যয় করে, তখন এই সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা সত্যিই বর্ণনাতীত! স্থির অথবা চঞ্চলতা দুটো স্বভাবই ভীষণ আনন্দের। পাখিটির শারীরিক বর্ণনা ও স্বভাব সম্পর্কে জানা যায়, এ পাখিগুলোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫১ সেন্টিমিটার। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মূলত এদের প্রজনন মৌসুম। এ সময় এরা প্রাকৃতিক জলাশয়ের কাছে ঝোপঝাড়ে, বড় গাছের কোটরে বাসা তৈরি করে। ৭ থেকে ১১টি ডিম দেয়। ২২ থেকে ২৪ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।
প্রজনন মৌসুমে এরা জোড়া হয়ে ছোট-বড় জলাশয়, ডোবা, বিল ও হাওরে ছড়িয়ে –ছিটিয়ে যায়। এদের মূল খাদ্য পানিতে থাকা জলজ উদ্ভিদ, নতুন কুঁড়ি, শস্যদানা, ছোট মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড়, শামুক, কেঁচো ইত্যাদি।
দলের পুরো পাখিরা কিন্তু এক সাথে ঘুমায় না। কিছু পাখি জেগে থেকে চিল, বাজপাখি প্রভৃতি শত্রুকে পাহারা দেয়। পরবর্তীতে আগে যারা জেগেছিল তার পরে ঘুমায়। এভাবে একদল জেগে একদল ঘুমিয়ে নিজেদের পুরো দলের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।
পদ্মকুড়ি বিলে ঘুরতে আসা মুরাদ হাসান মুন্না জানান, আমি সময় পেলেই প্রকৃতি দেখতে ঘুরতে আসি। কাইলান ও পদ্মকুড়ি বিলে পাখি দেখতে আসেছি। এখানে প্রায় সারাবছরই দেশীয় এবং বিদেশী পাখি দেখা যায়।
এখানে সরালি হাঁস ছাড়াও শামুকখোল, জাকানাসহ নানা জাতের পাখির বিচরণ অহরহ দেখা যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যা বেলায় এই পাখিগুলোর কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে যায় সমস্ত এলাকা।
পাখি প্রেমী এবং শিক্ষাবিদ মো. কামাল হোসেন। তিনি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র বিষয়ে সমৃদ্ধ ধারনা রাখেন। তিনি পদ্মকুড়ি বিলের সরালি হাঁসের ব্যাপারে বলেন, সরালি হাঁস কখনোই পরিযায়ী পাখি নয়। এরা আমাদের দেশেরই পাখি।
মানুষ না জেনে এই পাখিকে পরিযায়ী পাখি হিসেবে উল্লেখ করে। ফলে সাধারণ মানুষ ভুল নামটি জানছে। এক্ষেত্রে পাখির ছবির সাথে পাখির সঠিক নামটি জানা খুবই জরুরি। দায়িত্বশীল গণমাধ্যম সরালি হাঁসের এই সঠিক তথ্যগুলো পাঠকের কাছে তোলে ধরবে বলে আশা করি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ূন কবির জনান, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের শৃঙ্খলা রক্ষায় এই হাঁসগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পারিবেশে পাখিগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমাদের আরো সচেতন এবং দায়িত্বশীল হতে হবে।
মন্তব্য করুন
