রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ধর্মীয় কারণ নয়’, নদীভাঙন ও সংঘর্ষের শঙ্কায় নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি ‘তৌহিদী জনতার’

সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

‘সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ’-এমন খবর কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠে।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা একাধিক ব্যক্তি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ধর্মীয় কারণে নয়, বরং ওই এলাকার কৃষকদের ধান রক্ষা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে তারা এই আয়োজন বন্ধের দাবি তুলেছেন। এছাড়াও নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে থাকে। সংঘর্ষের কারণে গতবছরও নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক। তিনি ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে নিজের ফেসবুকে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেই পোস্টারে প্রথম ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়। নুর উদ্দিন ৮টা ৯ মিনিটে পোস্টটি এডিট করে আরেকটি পোস্টার যুক্ত করেন। সেখানে এভাবে লেখা দেখা যায়, ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা।’ ওই পোস্টারে ঈমানি দায়িত্ববোধে সবাইকে উপস্থিত হতে বলা হয়।

দ্বিতীয় পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভার’ কথা বলা হলেও তিনি মূলত নৌকাবাইচ বন্ধের জন্যই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। নুর উদ্দিন বলেন, ‘ওটা ভুল করে লিখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধ চাই। তবে এখানে ধর্মীয় কোনো বিষয় নেই। নদী ভাঙন ঠেকাতে একথা বলেছি।’

২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভার পর মাসুম বিন নুর উদ্দিন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি তিনি ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। নুর উদ্দিন নিজেই মূলত পেজটি পরিচালনা করেন।

সেই ভিডিওতে স্থানীয় আলেম এবং মুরব্বিদের কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওটির অধিকাংশ বক্তব্যে নদীভাঙনের কথা এসেছে, এসেছে ধান রক্ষার কথা। কয়েক জায়গায় ধর্মীয় অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হলেও নৌকাবাইচকে কোথাও ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসানো হয়-এমন অভিযোগ তুলে তাকে হারাম বলা হয়েছে।

ভিডিওতে এক আলেমকে বলতে শোনা যায়, ‘এলাকার পরিবেশ সুন্দর করার লাগি, এলাকার ধর্মীয় অবস্থানরে সুন্দর লাহার লাগি, বিশৃঙ্খলা থেহে বাঁচানোর লাগি, নদী ভাঙন ঠেকানোর লাগি এটা বন্ধ করতে অইবো।’

আরেকজন মুরব্বি ভিডিওটিতে বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র কইরা একবার এক লোক মারা গেছে। একজন মহিলা মারা গেছে। নৌকাবাইচে মাইর অইছে। নদীর দুই সাইডে ধানের ছড়া লাগানো আছে। এগুলো নষ্ট হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এগুলো মেনে নেবে না। অসামাজিক খারাপ কাজ হইব। এগুলো সম্পূর্ণ হারাম কাজ। এই কাজ দ্বারা এলাকার ধর্মীয় পরিবেশ ক্ষুণ্ন হইব।’

প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, ‘এটি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সম্পূর্ণ সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা নাগরিক সমাজের নামে কারা ব্যানার করেছে, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে এলাকার সচেতন নাগরিকদের মূল দাবি হলো এ অঞ্চলে আর নৌকাবাইচ আয়োজন না করা।’

তিনি বলেন, ‘অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেকে আহত হয়েছেন, এমনকি হাত-পা ভাঙার মতো ঘটনাও ঘটেছে। নৌকাবাইচের পাশের এলাকায় গানের আসরকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। ফলে বড় ধরনের এ আয়োজনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।’

বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘নৌকা বাইচের কারণে নদীর পাড়, আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় বছরই মারামারি হয়। গত বছরও মারামারির কারণে বাইচ হয়নি। সেই দিক বিবেচনায় নিয়ে এক পক্ষ চাচ্ছে নৌকাবাইচ বন্ধ হোক। তবে আরেক পক্ষ চাচ্ছে বাইচ হোক। বিষয়টা লোকাল একটা ইস্যু। উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে অনুমতি নিয়েই আয়োজকদের নৌকাবাইচ করতে হবে। তাই এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে নাকি হবে না, সেটা আমরাও বিবেচনা করে দেখব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন