শনিবার
১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নেত্রকোনায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি, ধান নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
নেত্রকোনায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি
expand
নেত্রকোনায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নেত্রকোনার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা বোরো ধান নিয়ে নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকেরা। পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে অকাল বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্র জানান, পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে কংশ ও ভোগাই নদীর পানি জারিয়া–জাঞ্জাইল পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ওইসব এলাকায় ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নদীর পানি এখনও জনবসতিতে প্রবেশ না করলেও তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। পানি আরও বাড়লে তা বন্যায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে খালিয়াজুড়ির ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সুমেশ্বরী, মগড়া ও ধলা–উব্দাখালীসহ জেলার অন্যান্য বড় নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, জেলায় ইতোমধ্যে ৯ হাজার ৫৬৫ হেক্টর ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে কলমাকান্দা উপজেলায় টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে উব্দাখালী, ভুগাই ও মহাদেও নদীর পানি বেড়ে কয়েকটি হাওর ও বিলে ঢুকে পড়েছে। এছাড়া আটপাড়া উপজেলার মশাহাতী, সুমাইখালী এবং পূর্বধলার জারিয়া এলাকার পাকলা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে গেছে। এতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটছেন, যাতে অন্তত আংশিক ফসল রক্ষা করা যায়।

আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী এলাকার কৃষক সাজিদ মিয়া বলেন,টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জমি তলিয়ে যাওয়ায় আধাপাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছি। শ্রমিকও পাচ্ছি না, পেলেও বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনও অর্ধেক ফসল কাটা বাকি।

জেলার খালিয়াজুড়ি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলা হাওর অধ্যুষিত এলাকা। এসব এলাকার মানুষের প্রধান জীবিকা বোরো ধান চাষ। চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমি হাওরাঞ্চলে। মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ৬৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ ধান কাটা হলেও জেলা হিসেবে তা ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

খালিয়াজুড়ির জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক তারা মিয়া বলেন,ধনু নদে পানি বাড়ার প্রবণতা থামছে না। হাওরের নিচু জমি ও বাঁধসংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পানি জমে গেছে। এখনও প্রায় অর্ধেক জমির ধান মাঠেই রয়ে গেছে, যা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ খেতে ধান পেকে গেলেও জমিতে পানি জমে থাকায় কাটতে সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা। অনেক স্থানে কম্বাইন হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে শ্রমিকসংকট যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাড়তি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।খালিয়াজুড়ির বিভিন্ন হাওরের অনেক স্থানে বাঁধের কাছাকাছি পানি পৌঁছে গেছে, যা কৃষকদের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে বজ্রপাতের ঝুঁকিও কৃষিকাজে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু প্রাণহানির ঘটনায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে মাঠে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ধান কাটার কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কংশ ও ভোগাই নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ধনু নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সামনের দিনগুলোতে তা বাড়তে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ফসলরক্ষা বাঁধগুলো স্বাভাবিক রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে হাওরের পরিস্থিতি সহনীয় থাকলেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কৃষকেরা যাতে দ্রুত ধান কাটতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank