

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের চরাঞ্চলে কৃষিকাজ মানেই অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই। বিস্তীর্ণ খোলা চরে কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র রোদে থাকতে হয়। হঠাৎ কালো মেঘ, দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি কোনোটিরই আগাম সতর্কতা থাকে না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে কৃষকদের জীবনে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র এই ইউনিয়নেই বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন এবং আহত হয়েছেন অন্তত দশজন কৃষক।
এই ভয়াবহ বাস্তবতায় চর বলরামপুর এলাকায় নির্মিত একটি কৃষক ছাউনি এখন আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বিশ্রামের জায়গা নয়, এটি হয়ে উঠেছে দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের কাজের বিরতিতে কয়েকজন কৃষক ছাউনির নিচে বসে গল্প করছেন। কেউ বাঁশিতে সুর তুলেছেন, কেউ খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। বলরামপুর, ফকিরটারী, চর টুপামারি ও গাছপাড়ি পাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই ছাউনি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) সম্প্রতি এই কৃষক ছাউনি নির্মাণ করেছে। ছাউনির সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড, যাতে ঝড়-বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেওয়া কৃষকেরা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকতে পারেন।
কৃষক ছাউনির জন্য জমি দান করেছেন চর টুপামারি গ্রামের বাসিন্দা হাসানুর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, আগে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে এসে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে দিশেহারা হয়ে পড়ত। আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না। এখন অন্তত জানি, বিপদ এলে দৌড়ে যাওয়ার একটা জায়গা আছে।
কৃষক সমশের আলী (৪৮) বলেন, আমাদের জমি বাড়ি থেকে অনেক দূরে। দুপুরে বাড়ি গিয়ে খেয়ে আবার কাজে ফিরতে গেলে সময় নষ্ট হয়। এখন এখানে বসেই খাই, বিশ্রাম নেই, ঝড় এলে আশ্রয়ও পাই।
জলবায়ু ঝুঁকির প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রে নয়, বসতভিটাতেও পড়ছে। দুধকুমার নদের ভাঙনে প্রতিবছর বহু পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। এমন ৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নিয়ে গাছপাড়ি গ্রামে শুরু হয়েছে জলবায়ু সহনশীল কৃষি উদ্যোগ।
ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতিতে সরকারি রাস্তার দুই পাশে মালচিং পদ্ধতিতে লাউ, কুমড়া, সিম ও করলা চাষ করা হচ্ছে। রাস্তার ওপর মাচা তৈরি করে এই চাষাবাদে যুক্ত হয়েছেন ভূমিহীন নারীরা।
দলনেত্রী লাইজু বেগম (৩৫) বলেন, ভাঙনে সব হারিয়েছিলাম। এখন ৩০ জন নারী মিলে সবজি চাষ করছি। ঘরের চাহিদা মিটিয়ে কিছু বিক্রি করতে পারলে নতুন করে দাঁড়াতে পারব।
ইএসডিও প্রতিটি পরিবারকে মাচা তৈরি ও বীজ কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছে।
ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙন আর বজ্রপাত দুই বিপদই বেড়েছে। তাই ভূমিহীনদের রাস্তার জমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আমরা তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।
এলাকার যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি জলবায়ু অভিবাসন কেন্দ্র। কেন্দ্রের সম্পাদক কুমারী প্রিয়াংকা রাণী জানান, নদীভাঙন ও জলবায়ু ঝুঁকিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা আমরা ইউনিয়ন পরিষদ ও ইএসডিওকে দিই, যাতে তারা সহায়তার আওতায় আসে।
তিনি বলেন, আমরা মানুষকে বোঝাই অভিবাসনের সময় কী ঝুঁকি থাকে, কোথায় গেলে নিরাপদ, পরিবারকে কীভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। গত এক বছরে শতাধিক পরিবারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
ওয়াবদা বাজারে চালু হয়েছে কমিউনিটি পর্যায়ের জলবায়ু তথ্যসেবা, বীজ ভান্ডার ও জৈব প্রযুক্তি শিক্ষণ কেন্দ্র। এখানে কৃষকদের বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার তৈরি এবং প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি পরামর্শক আল আমিন বলেন, প্রতিদিন ২০–৩০ জন কৃষক এখানে আসেন। তারা শিখছেন কীভাবে কম খরচে টেকসই কৃষি করা যায়।
নাগেশ্বরী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন বলেন, কৃষক ছাউনি, মালচিং পদ্ধতির সবজি চাষ ও জলবায়ু অভিযোজন কেন্দ্র সবই সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে এগুলো কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে করলে কৃষকেরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।
ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলে কৃষক ছাউনি, রাস্তার পাশে সবজি চাষ, বীজ ভান্ডার ও জলবায়ু তথ্যসেবা। সব মিলিয়ে বেরুবাড়ী এখন জলবায়ু অভিযোজনের এক বাস্তব উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা যে সম্ভব, বেরুবাড়ীর চরাঞ্চল তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
অনিশ্চয়তার চরে তাই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে নিরাপত্তা, স্বস্তি আর নতুন আশার সবুজ গল্প।
মন্তব্য করুন
