মঙ্গলবার
১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝালকাঠিতে এসএসসি ও দাখিলে ৯ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল

ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম
ঝালকাঠিতে এসএসসি ও দাখিলে ৯ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল
expand
ঝালকাঠিতে এসএসসি ও দাখিলে ৯ প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল

ঝালকাঠি জেলায় চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সাতটি মাদ্রাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং অবকাঠামো নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার দুটি, নলছিটি উপজেলার তিনটি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলার চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

সদর উপজেলার শাওরাকাঠী নব আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছর বিদ্যালয়টি থেকে ২৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কেউ পাস করতে পারেনি। গত বছর ১৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র একজন পাস করেছিল। বিদ্যালয়ে ১৪ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী রয়েছেন।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার মোস্তফাবাদ কাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ২৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ বছর মাদ্রাসাটি থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেনি। এমন ফলাফলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। এর আগে, ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় এ মাদ্রাসা থেকে ১১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নয়জন পাস করেছিল। মাদ্রাসাটিতে ১৩ জন শিক্ষক, একজন ক্লার্ক ও দুইজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ১৬ জন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের প্রতি মাসে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে বলে জানা যায়।

নলছিটি উপজেলার এ বছরের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় তিনটি মাদ্রাসা থেকে মোট ৪২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজনও পাস করেনি। মাদ্রাসা তিনটি হলো—সূর্যপাশা দাখিল মাদ্রাসা, রানাপাশা হোসাইনিয়া হাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও পশ্চিম কয়া আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসা।

সূর্যপাশা দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৭ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানে ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। রানাপাশা হোসাইনিয়া হাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। আর পশ্চিম কয়া আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানে ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।

কাঁঠালিয়া উপজেলার বাঁশবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২৫ জন, ঝোড়খালী দারুলহুদা গফুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২৪ জন এবং দত্তের পশারিবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এছাড়া বানাই রাবেয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন ছয়জন। এই চার প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করেননি।

অন্যদিকে, রাজাপুর উপজেলার এসজিএস সেকেন্ডারি স্কুলের ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন পাস করেছেন। নলছিটি উপজেলার পশ্চিম গোপালপুর হাইস্কুলের ১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যেও মাত্র একজন উত্তীর্ণ হয়েছেন।

এ বিষয়ে মোস্তফাবাদ কাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার কে এম আব্দুল্লাহ বলেন, “প্রতিষ্ঠানের ফলাফল এ বছর খুবই খারাপ হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। এ বছর পরীক্ষার ব্যাচটি খারাপ ছিল। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে না। মাদ্রাসায় ঠিকমতো আসে না।”

সূর্যপাশা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আলাউদ্দীন জানান, এ বছর সরকারি পরীক্ষা কারিকুলাম ভিন্ন এবং সিসি ক্যামেরার কারণে শিক্ষার্থীরা ভীত ছিল। তাদের পাঠদানে কোনো ঘাটতি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

রানাপাশা হোসাইনিয়া হাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. আবুল বাসার জানান, তিনি দীর্ঘ নয় বছর বরখাস্ত ছিলেন এবং শিক্ষক সংকটের কারণে ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে।

পশ্চিম কয়া আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মনিরুজ্জামান জানান, তার প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হতে পারেনি।

রাজাপুর উপজেলার এস.জিএস. সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক রহিমা আক্তার বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের ভবনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে স্থানীয়রা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে দিতে চান না। শ্রেণিকক্ষের ভেতরেও অনেক সময় আতঙ্কের মধ্যে ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসায় পড়ালেখার মান খারাপ হয়েছে এবং ফলাফলও খারাপ হয়েছে।”

এদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, এসব মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হয় না। রয়েছে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকট। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই মাদ্রাসাটির শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি যেমন কম, তেমনি শিক্ষক উপস্থিতি ও পাঠদান নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। কাগজ-কলমে মাদ্রাসায় ২৫২ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত চার-পাঁচজনের বেশি শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে দেখা যায় না বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে ঝালকাঠির জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু ছাঈদ বলেন, “আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব কী কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ফেল করেছে। কীভাবে সামনে ভালো করা যায়, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ দেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের মতে, শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসায় নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং তাদের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলার দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদেরও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এমন ফলাফলের কারণ খুঁজে বের করে মাদ্রাসাটির শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং সরকারি বেতন-ভাতার বিপরীতে শিক্ষার মান—সবকিছু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন