


হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহীনুর কামাল শাহীন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি দুটি কোয়ার্টার দখল, প্রশাসনিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ, জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত দালালি এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার নামে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী না হয়েও তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর ধরে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের একটি কক্ষ ব্যবহার করে কম্পিউটার, টেবিল ও চেয়ার বসিয়ে নিজের মতো করে অফিস পরিচালনা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে ‘সদর উপজেলার দ্বিতীয় ইউএনও’ বলেও মন্তব্য করছেন।
তবে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের যোগদানের পর শাহীনকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার কাছ থেকে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও আগের মতোই তিনি এখনো সরকারি কোয়ার্টার দখল করে বসবাস করছেন।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, ‘আমি কিছুদিনের মধ্যেই তাকে কোয়ার্টার ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।’
জানা যায়, শাহীনুর কামাল শাহীন সরকারি চাকরিজীবী না হয়েও সদর উপজেলা কার্যালয়সংলগ্ন সরকারি কোয়ার্টারে প্রায় ১৩ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি একাই দুটি কোয়ার্টার দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন এবং অন্যটি ব্যক্তিগত গাড়ির গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এ ছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি কক্ষ নিজের অফিস হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই কক্ষে বসেই জন্মনিবন্ধন সংশোধন, মৃত্যু নিবন্ধন, নাম ও বয়স পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা সংক্রান্ত কাজে দালালি করেন বলে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।
উপজেলার সরকারি ওয়েবসাইটেও তার ছবি, নাম ও মোবাইল নম্বর রয়েছে। সেখানে তার পদবি ‘উপজেলা আইসিটি টেকনিশিয়ান’ উল্লেখ থাকলেও এ ধরনের পদে সরকারি নিয়োগের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জেলার অন্য কোনো উপজেলায়ও এমন পদ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সরকারি গোপন নথিপত্র ব্যবস্থাপনার কম্পিউটার, ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আইডি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করতেন শাহীন। জন্মনিবন্ধন সংশোধন, বয়স পরিবর্তন, নাম সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজে নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। টাকা না দিলে আবেদন ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, জন্মনিবন্ধনের সাধারণ সংশোধনে ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা, বয়স বা নাম পরিবর্তনে ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং জটিল সংশোধনে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের নামেও দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের তথ্য বাংলা থেকে ইংরেজিতে সংশোধনের জন্যও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সমাজসেবা কার্যালয়ের বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, কৃষি অফিসের কৃষি কার্ড, সমবায় অফিসের মৎস্যজীবী কার্ড, যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, গ্রাম পুলিশ নিয়োগ, ইমাম ও হাফেজ নিয়োগ, সরকারি টেন্ডারসহ বিভিন্ন কাজে প্রভাব খাটিয়ে দালালি করতেন তিনি। এসব কাজে নিজের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রাম পুলিশ নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রতি ওয়ার্ডে প্রার্থী নির্ধারণ করে তাদের কাছ থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়নের ভুক্তভোগীরা জন্ম, মৃত্যু ও ভোটার কার্ড সংশোধনের জন্য তার কাছে গেলে অর্থ দিতে বাধ্য হন বলেও অভিযোগ করেছেন।
সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করলেও তিনি কোনো ভাড়া পরিশোধ করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ বিলও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, তার ব্যবহৃত কোয়ার্টারের বিদ্যুৎ বিল প্রায় দেড় লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস বিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় সেটি সরকারি কোষাগার থেকে পরিশোধ হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
জানা গেছে, শাহীন সদর উপজেলার আশেরা গ্রামের আহাদ মিয়ার ছেলে। সরকারি চাকরিজীবী না হয়েও তিনি সরকারি কোয়ার্টারে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। এ ছাড়া তার নামে ও স্ত্রীর নামে বিভিন্ন স্থানে সম্পত্তি থাকার কথাও স্থানীয়দের দাবি। তার মালিকানায় দুটি মাইক্রোবাস, দুটি ট্রাক ও একটি মোটরসাইকেল রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজের গাড়ি ইউএনওর সরকারি গাড়ির পাশে কোয়ার্টারের ভেতরে রাখেন। এ কারণে অনেকেই তাকে ‘সদর উপজেলার দ্বিতীয় ইউএনও’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শাহীনুর কামাল শাহীন বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই। কোনো কিছু জানার থাকলে ইউএনও অফিসারের সঙ্গে কথা বলুন।’
বর্তমান ইউএনও আব্দুল্লাহ আবু জাহের তাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর নিজের কাজ ফিরে পেতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে তদবির করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শাহীন অবৈধভাবে কোয়ার্টারে বসবাস ও ইউএনও কার্যালয়ে দালালি করে আয় করা অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ব্যয় করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কোয়ার্টার দখল, প্রশাসনিক কাজে প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি সেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।