


লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় একের পর এক নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে হবিগঞ্জ জেলায়। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়া জেলার ৩৮ যুবকের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। এরই মধ্যে নতুন করে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে আরও ২ যুবক ৯ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে, তিন সন্তানের জনক লুৎফুর রহমান (৪০) এবং তার বায়রা ভাই লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া (তিনিও তিন কন্যা সন্তানের জনক) দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ডিসেম্বর বাড়ি থেকে লিবিয়ায় যান। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন মাস অবস্থানের পর গত ২১ মার্চ তারা পরিবারকে জানান, সেদিনই লিবিয়া থেকে নৌকাযোগে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দালাল আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, তারা গ্রিসে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজদের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত বার্তা না পাওয়ায় সন্দেহ ও উৎকণ্ঠা আরও বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে সালামের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে ২৭ মার্চ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসগামী একটি নৌকাডুবির ঘটনায় ২২ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়, যাদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে। খাদ্য ও পানির সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা প্রাণ হারান বলে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর নিখোঁজদের পরিবারে শোক ও উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়।
নিখোঁজ লুৎফুর রহমানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে আমার ভাই ও জুনাইদকে বিদেশে পাঠানো হয়। ২১ মার্চ তারা নৌকায় ওঠার কথা জানায়। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। আমরা শুধু জানতে চাই তারা বেঁচে আছে, না মারা গেছে।”
সানাবই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শাহনেওয়াজ জানান, নিখোঁজদের পরিবারগুলো চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, “লুৎফুর রহমানের বৃদ্ধ পিতা, স্ত্রী ও সন্তানরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আমরা দ্রুত তাদের সন্ধান এবং দালালদের গ্রেপ্তার দাবি করছি।”
গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়া থেকে ইতালিগামী একটি নৌকায় করে হবিগঞ্জের ৩৮ যুবক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার অগ্রগতি নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। এ ঘটনায় গত ২১ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ সদর থানায় মানবপাচার চক্রের ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সাজিদ মিয়া নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে প্রধান অভিযুক্তসহ অধিকাংশ আসামি এখনো পলাতক রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মানবপাচারের সাথে জড়িত থাকা অভিযুক্তরা।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- আব্দুল গণি (৭০), পিতা-মৃত আব্দুর ছত্তার, সাং-পশ্চিমভাগ, ডাকঘর-শিবপাশা, ইউনিয়ন-৫নং শিবপাশা, থানা-আজমিরীগঞ্জ, জেলা-হবিগঞ্জ। সামাউন মোল্লা ওরফে হাসান আশরাফ (২৬), পিতা-আব্দুল গণি। মোঃ রুমান মিয়া (৩৬), পিতা-মৃত নেহার মনি। উমান মিয়া (২৭), পিতা-মৃত নেহার মনি। মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ছাদক মনি (৬৫), পিতা-মৃত আব্দুল ছত্তার।মোঃ রিয়াদ চৌধুরী বাপ্পী (২৫), পিতা-মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। আজাদ মিয়া (৪০), পিতা-সাবান মিয়া। আব্দুল মুকিত মাস্টার (৫০), পিতা-আব্দুল জব্বার। মুফতি সামায়ুন কবির (৫৫), পিতা-মৃত মোঃ আজিজুর রহমান। সাজিদ মিয়া (৬০) [গ্রেপ্তার], পিতা-মৃত আব্দুল সত্তার। সুভাষ মিয়া (৩৫), পিতা-আলী আকবর, একই ঠিকানা। ঝর্ণা আক্তার (৩৫), স্বামী-মোতাব্বির মিয়া, সাং-প্রতাপপুর, ডাকঘর-সুনারু, থানা-বানিয়াচং, জেলা-হবিগঞ্জ।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা জনপ্রতি ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। পরে লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে চারটি নৌকা ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, যার একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ হয়ে যায়।
৩৮ জন নিখোজের ঘটনায় বানিয়াচং, আজমিরিগঞ্জ থানা’সহ আদালতে আরও একাধিক মামলা আছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, মানবপাচার চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং নতুন করে বেকার যুবকদের ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করছে। অনেকেই জমি বন্ধক ও ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছেন, কিন্তু এখন না পাচ্ছেন সন্তানের খোঁজ, না পাচ্ছেন অর্থ ফেরত।
হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার হোসেন জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সিরাজুল মৌলা বলেন, “ইতোমধ্যে একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে মানবপাচার দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। অধিকাংশ মূলহোতা বিদেশে অবস্থান করায় তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় প্রমাণের অভাব বা ভয়ভীতির কারণে মামলা করলেও বিচার পাচ্ছেন না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানবপাচার সংক্রান্ত ৪ হাজার ৩৬০টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৪৬টি তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ১৪টি বিচারাধীন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার রুটটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই পথে প্রাণহানির ঘটনাও সবচেয়ে বেশি। দালালরা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাঠালেও বাস্তবে তারা নির্যাতন, অর্থ আদায় ও মৃত্যুঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
নিখোঁজদের পরিবারের একটাই দাবি তাদের স্বজনদের অবস্থান দ্রুত জানাতে হবে এবং মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন