

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সবুজ পাহাড়ে ঘেরা স্বচ্ছ নীলাভ জলরাশির চাম্বি লেক যেন প্রকৃতির এক নীরব কবিতা। পাহাড়ের ছায়া যখন আয়নার মতো লেকের বুকে মিশে যায়, তখন দৃশ্যটি হয়ে ওঠে মোহময়।
কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, নির্মল বাতাস আর শান্ত জলরেখার টানে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকরা। পাহাড় আর লেকের এই অপূর্ব সহাবস্থান লোহাগাড়ায় পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা, ফারাঙ্গা ও নারিশ্চা গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের আজিজনগর ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বি গ্রাম নিয়ে প্রায় ১০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত চাম্বি লেক। বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি সক্রিয় ঝরনার স্বচ্ছ জল মিলেই এই লেকের সৃষ্টি।
পূর্বদিকে সমতল ভূমি এবং বাকি তিনদিকে পাহাড় বেষ্টিত থাকায় এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে অনন্য ও চোখ জুড়ানো। লেকের পাশেই হাতির প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্র থাকায় পর্যটকদের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন চুনতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উদ্যোগে চাম্বি খালে রাবার ড্যাম নির্মাণ ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দেশের ১০টি রাবার ড্যাম প্রকল্পের একটি হিসেবে ২০১৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
এলজিইডির অংশগ্রহণমূলক ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ সেক্টর প্রকল্পের আওতায় উত্তর-দক্ষিণে ২৫ মিটার দীর্ঘ রাবার ড্যাম নির্মাণ শেষে ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি এর উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে চাম্বি লেকে রয়েছে কৃত্রিম পানির ফোয়ারা, পাখি ও প্রাণীর ভাস্কর্য, স্পিডবোট, প্যাডেল বোট, লাইফ বোট ও নৌকা। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য যুক্ত করা হয়েছে ফ্যামিলি ট্রেন এবং চালু রয়েছে ‘শুধু আমরাই’ রেস্টুরেন্ট। হ্রদের মাঝখানে অবস্থিত ‘মায়া দ্বীপে’ যাওয়ার জন্য রয়েছে ড্রামভেলা।
পাহাড়ের টিলায় নির্মিত গোলঘরগুলো থেকে উপভোগ করা যায় সবুজ পাহাড় আর নীল জলের বিস্তৃত দৃশ্য। তবে এখানে এখনও রাতযাপনের ব্যবস্থা চালু হয়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, চাম্বি লেককে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে সবুজ পাহাড় ও লেকের এই অনন্য সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সদস্য রেজাউল বাহার রাজা জানান, রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে এখানে পানি সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে। ড্যামের পানিতে প্রায় ৫০০ একর জমিতে সেচ সুবিধা মিলছে, এতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি লেকের পানি মাছ চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় স্থানীয় মৎস্য উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সমবায় সমিতির সভাপতি মাস্টার মাহবুবুর রহমান বলেন, কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি চাম্বি লেক লোহাগাড়াকে পর্যটনের মানচিত্রে তুলে ধরছে। শান্ত ও নির্মল পরিবেশের কারণে এটি দর্শনার্থীদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতে এখানে কটেজ, সুইমিংপুল, ওয়াটার রাইড, খেলার মাঠ ও আধুনিক রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চুনতির চাম্বি রাবার ড্যাম একদিকে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে এর সৌন্দর্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে লেকের সৌন্দর্যবর্ধনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রকৃতির নীরব ভাষায় কথা বলা চাম্বি লেক আজ শুধু একটি জলাশয় নয় এটি সবুজ পাহাড় আর নীল জলের এক চিরসবুজ গল্প।
মন্তব্য করুন