

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সরকারি দায়িত্বের বাইরে গিয়ে নিজের বাসায় ঘর ঝাড়ু দেওয়া, কাপড় ধোয়া, হাঁস-মুরগি দেখাশোনা থেকে শুরু করে সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া সবকিছুই করাতেন পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার, এমন অভিযোগ তুলেছেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক বেয়ারার। দাদি মারা যাওয়ার দিনও জানাজা ফেলে এডিসির বাসায় গৃহকাজে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেওয়ার পর এখন অভিযোগকারীকে চাপ দিয়ে তা প্রত্যাহার করানোর চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার বেয়ারার মো. আল মামুন রিয়াদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওই অভিযোগ করেছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। তবে অভিযোগটি তুলে নিতে ভুক্তভোগীকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া এবং অন্যত্র বদলির হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, গত ২৭ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন আল মামুন রিয়াদ। পরে ১৮ মে মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-৪ শাখা থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়। ১৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেয়, আর ১৭ জুন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসককে সাত কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়। ২২ জুন জেলা প্রশাসক দুই পক্ষকে তদন্ত শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেন।
নির্ধারিত শুনানি গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় হওয়ার কথা থাকলেও তা শুরু হয় বিকেল ৫টায়। শুনানিতে অভিযোগকারী আল মামুন রিয়াদ উপস্থিত থাকলেও অভিযুক্ত এডিএম তারেক হাওলাদার উপস্থিত ছিলেন না বলে অভিযোগ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তদন্তকাজ শেষ হয়ে রিয়াদ কক্ষ থেকে বের হওয়ার পরই তারেক হাওলাদার জেলা প্রশাসকের কক্ষে প্রবেশ করেন।
অভিযোগে আল মামুন রিয়াদ জানান, ২০২৩ সালের ২১ জুন তিনি বেয়ারার পদে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের মার্চে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি ভারী কাজ করার সক্ষমতা হারান। এরপরও সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁকে দিয়ে এডিএমের বাসার ঘর ঝাড়ু দেওয়া, মোছামুছি, কাপড় ধোয়া-শুকানো, হাঁস-মুরগির দেখাশোনা এবং দুই সন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়ার মতো ব্যক্তিগত কাজ করানো হতো। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র-শনিবারও কাজে যেতে বাধ্য করা হতো।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, গত ২৪ এপ্রিল রিয়াদের দাদি মারা যান। পরদিন শুক্রবার সকালে জানাজা-দাফনের প্রস্তুতির মধ্যেই এডিএম তারেক হাওলাদার ফোন করে তাঁকে দ্রুত বাসায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। দাদির মৃত্যুর কথা জানিয়ে সময় চাইলেও এডিএম তা অগ্রাহ্য করে ক্ষুব্ধ হয়ে লাইন কেটে দেন। পরে সহকারী কমিশনার তামিম নূর ইসলামও তাঁকে কাজে যেতে বলেন, কিন্তু রিয়াদ শোকাহত পরিবারের পাশে থাকার আকুতি জানিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
আল মামুন রিয়াদ বলেন, শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও গত এক বছর দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তাঁকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। কাজে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আপত্তিকর আচরণ ও বদলির হুমকি দেওয়া হতো। তিনি জানান, ২৬ এপ্রিল অফিসে গেলে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, যা তিনি গ্রহণ না করে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
রিয়াদের আরও অভিযোগ, মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের চিঠি আসার পর নেজারত শাখার সহকারী নাজির সাব্বির হোসেন তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এডিএমের পা ধরে ক্ষমা চেয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন। এর আগে অসুস্থ ভাগনেকে দেখতে ঢাকায় গেলে তাঁকে মুঠোফোনের লোকেশন এডিএমের হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করতে বাধ্য করা হয়, আপত্তি জানালে রাঙ্গাবালী উপজেলায় বদলির হুমকি দেওয়া হয়।
২৫ জুনের শুনানির বিষয়ে রিয়াদ বলেন, কক্ষে ঢোকার আগে তাঁর শরীর তল্লাশি করে মুঠোফোন রেখে দেওয়া হয়, আর ভেতরে গোপনীয় শাখার সহকারী কমিশনার তানভীর হাসান শুনানির ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ উল আলম ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহসিন উদ্দিন।
উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সহকারী নাজির মো. সাব্বির হোসাইন অভিযোগ প্রত্যাহার করানোর চেষ্টার কথা অস্বীকার করে বলেন, বিষয়টি এখন তাঁদের পর্যায়ে নেই, এ নিয়ে সাক্ষাতে কথা বলা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত এডিএম মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর মন্তব্য জানা যায়নি।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে মতামত চাওয়া হয়েছে, তদন্ত করে মতামত দেওয়া হবে, তবে তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, ফাইলপত্র দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে হবে এবং তদন্ত চলাকালে মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই এ নিয়ে মতামত দেওয়া যাবে।