বুধবার
০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফাঁদে বন্দি বাঘ, সংকটে সুন্দরবন

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
ফাঁদে বন্দি বাঘ
expand
ফাঁদে বন্দি বাঘ

সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়া একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের সাম্প্রতিক উদ্ধার আবারও সামনে এনে দিয়েছে মানুষ ও প্রকৃতির দীর্ঘদিনের সংঘাতের নির্মম বাস্তবতা। রোববার (৪ জানুয়ারি) রাতে বনবিভাগের বিশেষজ্ঞ দল ট্রানকুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘটিকে অচেতন করে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে খুলনা বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।

বনবিভাগ সূত্র জানায়, বাঘটির সামনের বাম পা ফাঁদে আটকে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় চার থেকে পাঁচ দিন ধরে বাঘটি ফাঁদে আটকে ছিল। মোংলার শরকির খাল এলাকা থেকে পাওয়া সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার থেকেই উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। ঢাকাসহ খুলনা থেকে আগত ভেটেরিনারি সার্জন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত দলটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির জানান, বাঘটি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাকে স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা শেষে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই একটি ঘটনা শুধু একটি বাঘ উদ্ধারের খবর নয়। এটি সুন্দরবনের বর্তমান সংকটের প্রতীক। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে যে সংঘাত। তা আধুনিক সময়ে এসে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বন উজাড়, শিল্পায়ন, বসতি সম্প্রসারণ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিষ্টি পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চোরাশিকার। সব মিলিয়ে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক দশকে সুন্দরবনে নানা কারণে অন্তত ১২০টি বাঘ মারা গেছে। শুধু চোরাশিকারিদের হাতেই প্রতিবছর গড়ে ৩ থেকে ৫টি বাঘের মৃত্যু হয়। বাঘের চামড়া ও হাড় আন্তর্জাতিক কালোবাজারে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়ায় এই শিকার বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘ বাঘ ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করে, তবু পাচার থেমে নেই।

একসময় বাংলাদেশের ১৭টি জেলাজুড়ে অবাধে বিচরণ করত বাঘ। আজ তা সীমিত হয়ে এসেছে কেবল সুন্দরবনে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ১৯০০ সালের শুরুতে যেখানে বিশ্বে প্রায় এক লাখ বাঘ ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,২০০টিতে।

বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানা হিসাব। সর্বশেষ ২০২৩–২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি, যা আগের গণনার তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি। যদিও গ্লোবাল টাইগার ফোরামের একটি ২০২৫ সালের তথ্যে বাংলাদেশে মোট বাঘের সংখ্যা ১৪৬টি বলা হয়েছে, তবু সুন্দরবনের নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য জরিপে ১২৫টিই নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে ধরা হচ্ছে। পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এই সামান্য বৃদ্ধি আশার আলো দেখালেও তা মোটেও নিরাপদ অবস্থান নয়।

সুন্দরবন একাডেমীর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়। এটি সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক। খাদ্যশৃঙ্খল ঠিক রাখা থেকে শুরু করে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অপরিসীম। যে বনে বাঘ আছে, সেই বনই সুস্থ। বাঘ কমে যাওয়া মানে পুরো বনব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া। এই কারণেই ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনায় বাঘের অবস্থান সুপ্রাচীন। টিপু সুলতানের ‘শের-ই-মহীশূর’ উপাধি থেকে শুরু করে ‘বাংলার বাঘ’, সবখানেই বাঘ শক্তি, সাহস ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বেলা খুলনার সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক। যা আজ আমরা ঠেলে দিচ্ছি বিলুপ্তির পথে। বালিনিজ, জাভানিজ ও কাস্পিয়ান টাইগার ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনও আজ চাপে সুন্দরবন শুধু বাঘের আবাস নয়। এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনরক্ষাকারী ঢাল। দেশের বনজ সম্পদের প্রধান উৎস এবং এক অনন্য জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। প্রায় ৭ লাখ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাঘ বাঁচানো মানে কেবল একটি প্রজাতি রক্ষা করা নয়। নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, চোরাশিকার দমন, বনাঞ্চলে শিল্পায়ন বন্ধ, স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি গণসচেতনতা।

ফাঁদে আটকে পড়া বাঘটি যদি আমাদের চোখ খুলে দেয়। যদি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে “বাঘ আছে বলেই সুন্দরবন আছে”। তবেই এই উদ্ধার শুধু একটি সংবাদ নয়, হয়ে উঠবে একটি সতর্কবার্তা। নচেৎ ইতিহাসের পাতায় বেঙ্গল টাইগারও যুক্ত হবে হারিয়ে যাওয়া প্রজাতির তালিকায়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X