

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


১৯ মে, আলজেরিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য দিন। ১৯৫৬ সালের এই দিনে আলজেরিয়াজুড়ে এবং ফ্রান্সে অবস্থানরত আলজেরীয় ছাত্রসমাজের মধ্যে ঘটে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। শত শত শিক্ষার্থী—যাদের কেউ ভবিষ্যতের ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক—হঠাৎ করেই শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতার লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (FLN) আহ্বানে আলজেরিয়াকে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে অংশগ্রহণ করেন শিক্ষার্থীরা।
১৯৫৪ সালের ১ নভেম্বর আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা জোরদার হচ্ছিল। কিন্তু ফরাসি সরকার এটিকে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে দেখিয়ে আলজেরিয়ার শিক্ষিত শ্রেণিকে আলাদা করে রাখতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, ফরাসি শিক্ষায় শিক্ষিত এই তরুণরা কখনোই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবে না। ফ্রান্স যখন দাবি করছিল, আলজেরিয়ার শিক্ষিত সমাজ স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ নয়—ঠিক তখনই এক প্রজন্মের ছাত্র, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক ও নার্স সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে ইতিহাস গড়ে। ১৯৫৬ সালের ১৯ মে, তারা বই-খাতা ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যোগ দেয় স্বাধীনতার লড়াইয়ে।
এদিকে ১৯৫৬ সালের শুরুতে দমন-পীড়ন চরমে পৌঁছে। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গি মোলের নেতৃত্বে প্রায় ৪ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়। গ্রাম ধ্বংস, গণউচ্ছেদ, নির্যাতন—সবই চলতে থাকে। ছাত্রনেতা বেলকাসেম জেদ্দুর ও চিকিৎসক বেনাওদা বেনজারজেবসহ শিক্ষিত সমাজের অনেককেই হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়—শিক্ষিতরা আন্দোলনের বাইরে নয়, বরং তাদের দমন করতেই এই কৌশল।
১৯৫৫ সালে প্যারিসে গঠিত জেনারেল ইউনিয়ন অব আলজেরিয়ান মুসলিম স্টুডেন্টস (ইউজিইএমএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ১৯৫৬ সালের মার্চে সংগঠনটি স্বাধীনতাকে প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করে এবং জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট (FLN)-এর পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৫৬ সালের ১৭ ও ১৮ মে আলজিয়ার্সে বৈঠকের পর ইউজিইএমএ ঘোষণা দেয়—সব ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জন করে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। তাদের ঘোষণায় বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঞ্চ ছেড়ে আমাদের যেতে হবে যুদ্ধক্ষেত্রে। এখন নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই।”
এই আহ্বানে দেশ-বিদেশে থাকা আলজেরীয় শিক্ষার্থীরা ব্যাপক সাড়া দেয়। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইনসহ সব বিভাগের ছাত্ররা একযোগে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। কেউ সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়, কেউ শহরে গোপনে সংগঠনের কাজ করে, আবার বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মহলে আলজেরিয়ার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবা দেয়, ফার্মেসির ছাত্ররা ওষুধ সরবরাহ করে, প্রকৌশলীরা যোগাযোগ ও অবকাঠামো গড়ে তোলে। ফলে এই আন্দোলন শুধু গ্রামীণ বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ থাকেনি—এটি হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় আন্দোলন, যেখানে শিক্ষিত সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল স্পষ্ট।
আন্দোলন দমনে ফ্রান্স কঠোর পদক্ষেপ নেয়। বৃত্তি বাতিল, নজরদারি ও গ্রেপ্তার বাড়ানো হয়। ১৯৫৮ সালে ইউজিইএমএ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সংগঠনটি তিউনিসে নির্বাসনে গিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যায় এবং স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।
আলজেরিয়া ১৯৬২ সালের ৫ জুলাই স্বাধীনতা অর্জন করে। এরপর এই ছাত্ররাই দেশে ফিরে রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দেয়—মন্ত্রী, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও কূটনীতিক হিসেবে। স্বাধীনতার সময় দেশটিতে নিরক্ষরতার হার ছিল ৮৫ শতাংশের বেশি এবং উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থী ছিল তিন হাজারেরও কম।
দেশটিতে স্বাধীনতার পর শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে আলজেরিয়ায় ১১৫টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করে। নারীদের অংশগ্রহণও বেড়ে ৬০ শতাংশের বেশি হয়েছে।
আজকের তরুণপ্রধান আলজেরিয়া সেই ১৯৫৬ সালের চেতনারই ধারাবাহিকতা। ১৯ মে শুধু একটি দিন নয়—এটি এক প্রজন্মের ত্যাগ ও আরেক প্রজন্মের দায়িত্বের প্রতীক। এই দিনটি প্রমাণ করে—শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, বরং একটি জাতির স্বাধীনতা ও অগ্রগতির জন্যও শক্তিশালী হাতিয়ার।