বুধবার
২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ-বয়সসীমা লঙ্ঘন

আল-আরাফাহ্ ব্যাংকে অনিয়মের পাহাড়

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স
  • নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় অংশ চেয়ারম্যান, এমডি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারিশে নিয়োগ।
  • ৩৯ জনকে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ।
  • ২৯ জনের ছিল না পূর্ব অভিজ্ঞতা, ২০ জনের নেই ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা।
  • সার্ভিস রুল ভেঙে বয়সসীমার বাইরে অন্তত ২৭ জনকে নিয়োগের অভিযোগ।
  • ভাইভা নেওয়ার দাবি করলেও প্রমাণ দেখাতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনের পর দেশের আমূল পরিবর্তন আসে। এর বাতাস লাগে দেশের ব্যাংক খাতেও। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও এস আলম সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদে পরিবর্তন আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই ধারায় আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকেও পরিবর্তন হয় চেয়ারম্যান ও এমডির।

পট পরিবর্তনের পর এস আলম ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক মুক্ত করতে উদ্যত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে ইসলামী ভাবধারার আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে।

শুরুতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের ভাই আব্দুস সামাদ লাবুর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খাজা শাহরিয়ারকে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এস আলম মুক্ত হলেও অনিয়ম ও দুর্নীতি মুক্ত হতে পারেনি বেসরকারি খাতের আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৫৪৭ জনকে চাকরিচ্যুত করে ব্যাংকটি। চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে দুর্নীতি ও অযোগ্যতা এবং ব্যাংকের সুশাসন আনয়নের কারণ দেখায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ নিযুক্ত হওয়ার পরে ব্যাংকটিতে নিয়োগ পায় অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে এরমধ্যে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ হয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সুপারিশে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে এসব ভয়াবহ চিত্র। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তির নিয়োগ হয়েছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান-এমডি ও ঊর্ধ্বতনদের সুপারিশে। অথচ এস আলম মুক্ত হয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলবে বলে আশা করেছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই অনিয়ম শুরু করেন চেয়ারম্যান খাজা শাহরিয়ার। নিজের পছন্দমত লোকজন নিয়োগ দিয়েছেন। এতে বেড়েছে ব্যাংকের ব্যয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ হয়েছে ১০৭ জনের। এরমধ্যে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) একজন, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) ২ জন, এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) ৬ জন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) ১১ জন, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) হিসেবে ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া আরো অন্যান্য পদে ৭৮ জনকে নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ।

নিয়োগ পাওয়া বেশিরভাগই বিভিন্ন জনের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কর্মচারী পর্যায়ে রয়েছে গাড়ি চালক ২ জন, মেসেঞ্জার ২ জন এবং টি বয় ৩ জন। মোট ১০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ২৯ জনের নেই কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কোনো ধরণের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই।

বাকি ৭৮ জনের মধ্যে ৫৮ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে এনসিসি, ডাচ্ বাংলা, ফার্স্ট সিকিউরিটি, সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ও ট্রাস্ট ব্যাংকে কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া বাকি ২০ জনের ছিল না কোনো ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা। তবে এই ২০ জনের মধ্যে ১২ জন ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান লঙ্কাবাংলা ও ফিনিক্স ফাইন্যান্সে চাকরিরত ছিলেন। এছাড়া ৪ জন ছিলেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।

লঙ্কাবাংলা থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের আবার দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি ও ইনিক্রিমেন্ট সুবিধা। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১০৭ জনের সবাইকেই পূর্ববর্তী চাকরির বেতনের চেয়েও বেশি বেতনে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের সার্ভিস রুল অনুযায়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা থাকলেও মানা হয়নি সে নিয়ম। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এভিপি ৪ জন, এফএভিপি পদে ২ জন, প্রিন্সিপাল অফিসার ৭ জন, এসএভিপি পদে ৪ জন, এসইও ৩ জন, এসপিও ১ জন, এসভিপি ২ জন ও এভিপি পদে ৪ জনকে সার্ভিস রুলের নিয়ম অমান্য করে বেশি বয়সে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সার্ভিস রুল অমান্য করে ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়।

নিয়োগে আরো চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়েছে আল-আরাফাহ্ কর্তৃপক্ষ। একজন প্রার্থী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরে আবেদন করেন। তাকে ভাইভাতে বাদ দেওয়া হয়। সেই একই প্রার্থীকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পরবর্তীতে ভাইভা নিয়ে নিয়োগ প্রদান করে ব্যাংক।

এদিকে আগস্ট ২০২৪ এর পরে নিয়োগপ্রাপ্তদের ভাইভা গ্রহণ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ভাইভা গ্রহণের কোনো প্রমাণ যেমন হাজিরা খাতা কিংবা সিসিটিভি ফুটেজ আল-আরাফাহ্ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংককে দেখাতে পারেনি।

নিয়োগপ্রাপ্ত ১০৭ জনের ব্যক্তিগত নথি পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। এসব নথিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের বায়োডাটায় কলম ও পেন্সিল দিয়ে সাংকেতিক চিহ্ন দেখতে পায় পরিদর্শকরা। সেখানে C (Chairman), W (Md. Wadud), AMD (Additional Managing Director), DMD-MH (Deputy Managing Director Mohammad Hossain), MD-CC (Managing Director Current Charge), AMD -Investment, AMD সংকেত লিখে দেয় কর্তৃপক্ষ। নিয়োগপ্রাপ্তদেরকে এসব কর্তৃপক্ষের সুপারিশে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে বুঝানো হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয় আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খাজা শাহরিয়ার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাফাত উল্লাহ এবং ব্যাংকটির ডিএমডি মোহাম্মাদ হোসাইনের সঙ্গে। কিন্তু কারো সঙ্গেই কথা বলা সম্ভব হয়নি। কেউ ফোন ধরেননি। অফিসে গিয়ে কথা বলতে চাইলেও দেখাও করেননি কথা বলেননি কেউ।

পরবর্তীতে ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা জালাল আহমেদকে ফোন দিলে তিনি জানান, ‘এসব বিষয়ে আমার কথা বলার অধিকার নেই। আমি এইচআর পলিসির সাথে যুক্ত নই। এসকল অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেই কথা বলতে হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, 'যে পরিদর্শক দল এই রিপোর্ট করেছে তারাই সুপারিশ করবে কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের সুপারিশেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটেছে তা বুঝতে হবে। ব্যাংকটি যদি তার সার্ভিস রুলস ঠিক রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তবে এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু করার নেই।'

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন