


ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর দ্রুত দখলে নেওয়া হুথিদের অগ্রযাত্রাকে আঞ্চলিক চলমান যুদ্ধে ‘বড় মোড়’ হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যাডাম ব্যারন। তার মতে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব এলাকা দখলের ফলে হুথিরা বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) নিউ আমেরিকার ‘ফিউচার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর ফেলো অ্যাডাম ব্যারন আল জাজিরাকে বলেন, সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইনে ইরাক থেকে ড্রোন হামলার ঘটনাও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ‘বিস্ফোরণপ্রবণ পরিস্থিতির’ বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরে।
তিনি বলেন, ছয় মাস আগে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একাধিক আন্তঃসংযুক্ত সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে এসব সংঘাতের তীব্রতা কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কমছে।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে হুথিদের দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখলে নেওয়ার ঘটনাকে ‘নিঃসন্দেহে একটি বড় মোড়’ বলে উল্লেখ করেন ব্যারন।
তার ভাষ্য, এর ফলে ইয়েমেনের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থান হুতিদের জন্য বড় সামরিক সুবিধা তৈরি করেছে।
ব্যারন বলেন, সামরিক কোনো গোষ্ঠীর জন্য ইয়েমেনের কৌশলগত অবস্থান বিবেচনায় বাব আল মান্দেবের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বড় সুবিধা পাওয়া কঠিন।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার সমর্থিত বাহিনীগুলো খুব বেশি লড়াই ছাড়াই পিছু হটার বিষয়টিও আলাদাভাবে দেখছেন ব্যারন। তার মতে, এটি ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য একটি কৌশল হতে পারে।
তবে শুধু সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার মাধ্যমে হুতিদের এই এলাকা থেকে সরানো কঠিন হবে বলেও মনে করেন তিনি। এ জন্য একটি ‘ঐক্যবদ্ধ’ স্থলবাহিনী প্রয়োজন হবে বলে মন্তব্য করেন ব্যারন।
তার মতে, ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের সঙ্গে এর যোগসূত্র থাকায় হুতিদের এই অগ্রযাত্রা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
হুতিদের সাফল্য ‘ঐশ্বরিক বিজয়’
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সাম্প্রতিক সাফল্যকে ‘ঐশ্বরিক বিজয়’ হিসেবে প্রশংসা করেছে ইরান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম হুতিদের একের পর এক সামরিক সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মান্দাব প্রণালি বন্ধ করার কোনো ঘোষণা এখনো দেয়নি তেহরান।
হুথিরা চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি শহর ও দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে তারা। এর ফলে ইয়েমেনের সরকার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার হারিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুতিদের এই অগ্রগতির ফলে বাব আল মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে। ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ডের মাত্র প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের কাছে হুতিদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, পশ্চিম উপকূলে আনসারুল্লাহর জয় ‘ঐশ্বরিক বিজয়ের’ গল্প এবং কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে বছরের পর বছর দৃঢ়তার ফল।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও হুতিদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ২০২৪ সালের একটি বক্তব্য পুনরায় প্রকাশ করে বলেন, হুতিদের ‘প্রতিরোধ’ শেষ পর্যন্ত বিজয় এনে দেবে।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফও হুথিদের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অঞ্চলটির দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ঐক্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবেরও হুথিদের ‘বড় বিজয়’কে স্বাগত জানিয়েছেন। ইরানের কট্টরপন্থি গণমাধ্যমগুলোও হুতিদের সাফল্যকে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। একটি পত্রিকা এই অগ্রগতিকে ‘প্রতিরোধের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কী বলছে হুথিরা?
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে লোহিত সাগর ও বাব আল মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে হুথিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করেনি।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি শুক্রবার বলেছেন, সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া সব কোম্পানির জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদ। অর্থাৎ সৌদি জাহাজগুলোকে তারা এখনো অবরোধের আওতায় রাখছে।
হুথিদের হাতে লোহিত সাগর উপকূল ও কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ায় বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের চাপ তৈরির সক্ষমতা বেড়েছে। একটি ভিডিওতে হুথিদের এক কমান্ডারকে বলতে দেখা গেছে, জাহাজে হামলার জন্য এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রয়োজন হবে না; উপকূলে কামান বসিয়েও জাহাজ লক্ষ্য করা সম্ভব।
তবে ইরান এখনো হুথিদের এই অগ্রগতিকে সরাসরি বাব আল মান্দাব বন্ধের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরং বলেছে, হুথিরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। তাদের দাবি, ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগে সমাধান না আসার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা দীর্ঘদিনের অবরোধের কারণে ইয়েমেনিদের ধৈর্য হারানোর ফল। তেহরান হুথিদের শুধু ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখার ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা