


ভারতের ব্যাবসায়িক জগতের অন্যতম এক রূপকার এবং দূরদর্শী উদ্যোক্তা সুভাষ চন্দ্র, যাকে একসময় ‘এশিয়ার মারডক’ বলা হতো। তিনি মাত্র ১৭ টাকা পকেটে নিয়ে ব্যবসা শুরু করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ৮.৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ‘এসেল গ্রুপ’ সাম্রাজ্য।
১৯৯২ সালে ভারতের প্রথম বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ‘জিটিভি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় বিনোদন জগতকে চিরতরে বদলে দেন। এছাড়া থিম পার্ক, অবকাঠামো ও প্যাকেজিং খাতেও তার বিশাল বিনিয়োগ ছিল। কিন্তু অবকাঠামো খাতের অতিরিক্ত ঋণ এবং ব্যক্তিগত গ্যারান্টির ফাঁদে পড়ে সুভাষ চন্দ্রের সাম্রাজ্যে ধস নামে। বিজেপি সমর্থিত সাবেক সাংসদ সুভাষ চন্দ্র আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে।
গত মঙ্গলবার ভারতের ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যান্ড ট্রাইব্যুনাল-এনসিএলটি সুভাষ চন্দ্রের জন্য একটি ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এতে পাওনাদাররা তাদের মোট স্বীকৃত দাবি ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লাখ রুপির বিপরীতে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি রুপি পাবেন। এর মানে হলো, ঋণদাতাদের প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ লোকসান বা ‘হেয়ারকাট’ মেনে নিতে হবে। তবে ট্রাইব্যুনালের এ রায় নিয়ে ভারতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অনেকেই একে রাজনৈতিক রায় হিসেবে অভিহিত করে সমালোচনা করছেন। সমালোচকরা একে ভিআইপি ঋণ মওকুফ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, কৃষকরা যেখানে হাজার টাকা ঋণের জন্য আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়, সেখানে ২২ হাজাার কোটি রুপি মওকুফ করে দেয়া বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। স্যাঁরাফ অ্যান্ড পার্টনার্স-এর পার্টনার অভিষেক স্বরূপ এনডিটিভি-কে বলেছেন, এনসিএলটি-এর এই আদেশ একটি ভুল নজির স্থাপন করল। ৯৯ শতাংশের বেশি হেয়ারকাটসহ কোনো রেজোলিউশন প্ল্যানকে বাণিজ্যিক বুদ্ধিমত্তা বলা যায় না। বাণিজ্যিক বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তের অন্তত একটি বাণিজ্যিক যৌক্তিকতা থাকতে হবে।
এনসিএলটি-এর সিদ্ধান্তটি এসেছে ট্রাইব্যুনালের দুজন সদস্যের একটি বিভক্ত রায়ের পর। এরপর বিষয়টি এনসিএলটি সভাপতির নিযুক্ত তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মার কাছে পাঠানো হয়। শর্মা ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্টসি কোড-এর ১১৪ নম্বর ধারার অধীনে এই ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনাটি অনুমোদন করেন। বেশ কয়েকজন ঋণদাতা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন। এলআইসি হাউজিং ফিন্যান্স যুক্তি দিয়েছিল, তাদের দেওয়া পুনরুদ্ধারের পরিমাণ অত্যন্ত কম। তাদের স্বীকৃত দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৩২২ কোটি ৩৯ লাখ রুপি, যেখানে প্রস্তাবিত পরিশোধের পরিমাণ মাত্র ৩৮ লাখ রুপি। এলআইসি হাউজিং ফিন্যান্স এই প্রস্তাবটিকে ‘অচল এবং বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছিল। তবে ঋণদাতাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পরিকল্পনাটি অনুমোদন পায়। এই পরিকল্পনার পক্ষে ছিলেন ৮০.৮১ শতাংশ ঋণতাদা। এনসিএলটি উল্লেখ করেছে যে, সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যায়নে দেখা গেছে যে সেগুলোর মূল্য এই ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত অর্থের চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ট্রাইব্যুনাল এই পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হলে কী ঘটতে পারে তাও বিবেচনা করেছে। যদি সুভাষ চন্দ্রকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া ঘোষণা করা হতো, তবে পাওনাদাররা তাঁর আর্থিক সম্পদ থেকে সম্ভবত এর চেয়েও কম অর্থ উদ্ধার করতে পারতেন। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নটি কেবল এটি ছিল না যে ২২ হাজার ৬ কোটি রুপির তুলনায় সাড়ে ৬ কোটি রুপি কত কম। প্রশ্নটি ছিল; এই পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করলে পাওনাদাররা কি আরও ভালো অবস্থানে থাকবেন? ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, এটি প্রত্যাখ্যান করলে পাওনাদারদের আরও ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল বিবেক ইনফ্রাকন-এর নেওয়া একটি ঋণকে কেন্দ্র করে। সুভাষ চন্দ্র ১৭০ কোটি টাকার একটি ঋণের জন্য ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দিয়েছিলেন। যখন সেই ঋণটি খেলাপি হয়ে যায়, তখন ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফিন্যান্স সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে এই দেউলিয়াত্ব মামলাটি দায়ের করে। পরবর্তীতে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে এনসিএলটি সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদনটি গ্রহণ করে। সুভাষ চন্দ্রের জন্য এনসিএলটি-এর এই অনুমোদন তাঁর ব্যক্তিগত দেউলিয়াত্ব প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। তবে, ঋণদাতাদের জন্য এই হিসাবটি অত্যন্ত নির্মম এক বাস্তবতার গল্প বলে। যেখানে প্রতি ১০০ টাকা পাওনার বিপরীতে অনুমোদিত পরিকল্পনাটি মাত্র ৩ পয়সার মতো ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব করে। এদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ভিডিওতে ৭৫ বছর বয়সী সুভাষ চন্দ্র নতনি করে শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। সুভাষ চন্দ্র জানান, তিনি সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন এবং স্টার্ট-আপগুলোতে বিনিয়োগের জন্য তার পরিবারের কাছ থেকে টাকা ধারও নিতে পারেন। তিান বলেন, ‘আজ আমি খুব সহজভাবে কথা বলছি। আমি এমন একজন ব্যক্তির মতো কথা বলছি না যে সব কিছু হারিয়ে ফেলেছে। আমার কাছে শেষ যে সাড়ে ৬ কোটি রুপি অবশিষ্ট আছে, তা পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিশোধ করতে হবে। আমার একটি ছোট আবাসিক বাড়ি আছে, যা আমি ভাড়া দিয়েছি এবং সেই আয়ের মাধ্যমেই আমি আমার খরচ চালাচ্ছি। আমার কোনো আফসোস নেই। আমি আবারও উপার্জন করব। আমি একজন অগ্রগামী মানুষ। আমি জানি কীভাবে ভালো এবং নতুন কিছু করতে হয়। আমি তা করা চালিয়ে যাব।’
ভিডিও বার্তায় সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘আপাতত, সুইজারল্যান্ডে আমার যেসব বন্ধুরা বিনিয়োগের কাজ করেন, তাঁদের সাথে কাজ করার একটি পরিকল্পনা আমার রয়েছে। আগামী ১-২ সপ্তাহের মধ্যে আমি আপনাদের এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাব। এ ছাড়া পরিবার থেকে ২-৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আমাদের কিছু স্টার্ট-আপে বিনিয়োগ করতে পারি, যা সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।’
সূত্র: এনডিটিভি