

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একসময় ইউরোপের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম উদহারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো যুক্তরাজ্যকে। মার্গারেট থ্যাচার, টনি ব্লেয়ার কিংবা ডেভিড ক্যামেরনের মতো নেতারা বহু বছর সরকার পরিচালনা করেছেন। কিন্তু গত এক দশকে দেশটির দায়িত্বের এই ধারাবাহিকতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সোমবার (২২ জুন) যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিয়ার স্টারমার। এর ফলে গত এক দশকে দেশটি সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। যা আধুনিক ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক বিরল ঘটনা।
পদত্যাগের পর লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিট-এর সামনে সাংবাদিকদের স্টারমার জানান, তিনি দলের সিদ্ধান্তকে ‘সৌজন্যের সঙ্গে’ মেনে নেবেন এবং তার উত্তরসূরিকে পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বিশ্বের অন্যতম পুরোনো সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীরা বারবার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিচ্ছেন?
ব্রেক্সিট: যে গণভোট বদলে দিল রাজনীতির গতিপথ
যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বের এমন ধাবাহিক পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে বেক্সিট। এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ব্রিটিশ রাজনীতির কাঠামো, দলীয় ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পুনর্গঠন করেছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাজ্য এখন ‘শাসন-অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে মানুষের প্রকৃত মজুরি বাড়েনি। ব্রেক্সিটের কারণে মাথাপিছু জিডিপি কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ।
সরকারি ঋণের বোঝা এবং বিদ্যুতের দাম এখন জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, গ্রিনস এবং কট্টর ডানপন্থী 'রিফর্ম ইউকে'-র মতো দলগুলোর উত্থান ঘটছে।
দীর্ঘ ৪৭ বছর সদস্য থাকার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া এবং আইনগত সিদ্ধান্তের জন্য যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালের ২৩ জুন একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে দেশটির ৫২ শতাংশ ভোটার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে ভোট দেন।
যদিও তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটাররা বিপরীত রায় দিলে তিনি পদত্যাগ করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা।
তার উত্তরসূরি থেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেলেও সংসদে সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন। ফলে ২০১৯ সালের ২৪ মে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতা থেরেসা মে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
এরপর বরিস জনসন ব্রেক্সিট সম্পন্ন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তবে কোভিড-১৯ পরবর্তী বিতর্ক, প্রশাসনিক সংকট এবং দলীয় বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান দুর্বল করে দেয়। ফলে ৩ বছরের বেশি কিছু সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই।
ব্রিটেনে সবচেয়ে কম সময়—মাত্র ৪৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন লিজ ট্রাস, যা ব্রিটিশ ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম মেয়াদ। অর্থনৈতিক নীতির কারণে আর্থিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা তার প্রধানমন্ত্রিত্বকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ করে দেয়।
ঋষি সুনাক অর্থনীতি ও প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারেননি। নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে তার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
দীর্ঘদিনের বিরোধী দল লেবার পার্টি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায়। দলের নেতা কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারও ইতোমধ্যে টালমাটাল অবস্থায় পৌঁছে যায়। আর এই অবস্থায় তিনিও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
তার সময়কাল চিহ্নিত হয়েছে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, নীতিগত অবস্থান বদল এবং পরিষ্কার দিকনির্দেশনার অভাবে, এমন এক সময়ে যখন ব্রিটেন বিশাল সব চ্যালেঞ্জের মুখে।
স্টারমারের সরকার বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার আগে তিনি কী জানতেন, কী জানতেন না এবং কখন জানতেন, তা নিয়ে বিতর্ক।
সমস্যার মূল কারণ:
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। জনগণ ভোট দেন সংসদ সদস্যদের। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী হন।
এই ব্যবস্থার সুবিধা হলো দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব। কিন্তু এর একটি বড় মূল্যও আছে। দলের ভেতরে আস্থা হারালে প্রধানমন্ত্রীকে সাধারণ নির্বাচনের অপেক্ষা না করেই বিদায় নিতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকের প্রায় সব নেতৃত্ব পরিবর্তনের পেছনেই দেখা গেছে দলীয় অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ বিভাজন অথবা রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে।
