

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের এক অমর মহাকাব্য। ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ আর জাদুকরী ‘শতাব্দীর সেরা গোল’- একই ম্যাচে এই দুই অবিস্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী পুরো বিশ্ব।
তবে এই রূপকথার পেছনে লুকিয়ে আছে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো এক অবিশ্বাস্য ‘জার্সি কাহিনী’।
কোটি কোটি দর্শকের উন্মাদনার আড়ালে ম্যারাডোনা যে জার্সিটি গায়ে জড়িয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন, সেটি আসলে কোনো নামী ব্র্যান্ডের ল্যাবরেটরিতে তৈরি আধুনিক জার্সি ছিল না; বরং তা ছিল মেক্সিকোর এক সাধারণ ফুটপাত থেকে কেনা সস্তা এক টুকরো কাপড়।
ঘটনার সূত্রপাত মেক্সিকোর তীব্র গরম আর স্পনসর কোম্পানির খামখেয়ালিপদার্থ নিয়ে। আর্জেন্টিনার মূল আকাশী-নীল জার্সিটি ইংল্যান্ডের সাথে মিলে যাওয়ায় তাদের বিকল্প নীল জার্সি পরে নামার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আগের ম্যাচে সেই সুতির ভারী নীল জার্সি পরে ফুটবলারদের দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল।
ম্যাচের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে কোচ কার্লোস বিলার্দো বুঝতে পারেন, এই ভারী পোশাক পরে খেললে রোদে তাঁর দল শেষ হয়ে যাবে। স্পনসর কোম্পানি এত কম সময়ে হালকা জার্সি দিতে অস্বীকৃতি জানালে, কোচ মরিয়া হয়ে কিট ম্যানেজার রুবেন মোসচেল্লাকে পাঠান স্থানীয় বাজারে।
মেক্সিকো সিটির এক সাধারণ পাইকারি বাজার থেকে মোসচেল্লা দু’ধরনের হালকা নীল জার্সি কিনে আনেন। ভাগ্য নির্ধারণের সেই মুহূর্তে অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা একটি সাধারণ জার্সির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওঠেন, "এটা পরেই আমরা ইংল্যান্ডকে হারাবো।"
তবে সমস্যা আরও ছিল। বাজার থেকে কেনা সেই সাদামাটা জার্সিতে আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) কোনো লোগো কিংবা খেলোয়াড়দের নম্বর ছিল না। ম্যাচের বাকি তখন ২৪ ঘণ্টারও কম। আবারও শুরু হলো যুদ্ধকালীন তৎপরতা। মেক্সিকোর একটি স্থানীয় ক্লাবের নারী কর্মীদের ডেকে এনে রাতারাতি ইস্ত্রি করে জার্সির বুকে বসানো হলো খসড়া লোগো। আর পেছনে বসানোর জন্য কোনো ফুটবল নম্বর না পেয়ে, আমেরিকান ফুটবলের চকচকে রুপালী রঙের নম্বর কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে লাগানো হলো।
ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ফুটবলাররা হাতে পান এই 'হস্তনির্মিত' জার্সি। আর এই সস্তা, আনঅফিশিয়াল জার্সি গায়ে দিয়েই ম্যারাডোনা মাঠে নামিয়েছিলেন তাঁর পায়ের জাদু। ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে উপহার দিয়েছিলেন ইতিহাসের সেরা দুই গোল।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের স্টিভ হজের সাথে ম্যারাডোনা যে জার্সিটি বদল করেছিলেন, ২০২২ সালের এক নিলামে সেটি রেকর্ড ৯.৩ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১০০ কোটি টাকা) বিক্রি হয়। কোটি টাকার প্রযুক্তি আর স্পনসরশিপের এই যুগে ম্যারাডোনার এই জার্সি মনে করিয়ে দেয়, দিনশেষে ফুটবলের আসল জাদু পোশাকে নয়, থাকে খেলোয়াড়ের পায়ে আর রক্তে।
