

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রোজা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আচরণ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে—বিশেষ করে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা বা ভালোবাসার প্রকাশ কি রোজা ভেঙে দেয়?
ইসলাম একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এখানে মানবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করা হয়নি।
তবে রোজার পবিত্রতা ও আত্মসংযম রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআন, হাদিস এবং ফিকহের আলোকে এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা নয়; বরং আত্মসংযম ও তাকওয়া অর্জন।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় জিবরাঈল (আঃ) এর হাদিস ও রোজার শিক্ষা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)
তাই যে কোনো কাজ যা মানুষকে রোজা ভঙ্গের দিকে ঠেলে দিতে পারে, তা থেকে দূরে থাকাই রোজার শিক্ষা।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন,
“নবী (সা.) রোজা অবস্থায় তাঁর স্ত্রীদের চুমু দিতেন এবং আলিঙ্গন করতেন; তবে তিনি ছিলেন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিজের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু খাওয়া নিজেই হারাম নয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—নিজের প্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা।
আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিলে কি ওজু ভাঙে?
আরেক হাদিসে এসেছে,
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রোজা অবস্থায় চুমু খাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি অনুমতি দেন। অন্য একজন জিজ্ঞেস করলে তিনি নিষেধ করেন। পরে সাহাবারা বুঝতে পারেন
প্রথম ব্যক্তি ছিলেন বয়স্ক এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম ,আর দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন যুবক, যিনি উত্তেজনায় পড়ে যেতে পারেন। (সুনানে আবু দাউদ)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধান ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে—ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে।
যে কাজ সরাসরি রোজা ভাঙে না, কিন্তু রোজা ভাঙার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে—তা মাকরুহ বা নিষিদ্ধ।
চুমু খাওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথম অবস্থা স্বামী-স্ত্রী শুধু ভালোবাসা প্রকাশের জন্য চুমু খায়, এতে কোনো যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় না এবং সহবাস বা বীর্যপাতের আশঙ্কা নেই।
এই অবস্থায় রোজা ভাঙে না এবং অধিকাংশ আলেমের মতে এটি জায়েজ।
দ্বিতীয় অবস্থা
চুমু খাওয়ার ফলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কিন্তু বীর্যপাত বা সহবাস পর্যন্ত গড়ায় না। এই ক্ষেত্রে রোজা ভাঙবে না, তবে এটি মাকরুহ (অপছন্দনীয়), কারণ এতে রোজা ভাঙার ঝুঁকি রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু খাওয়া কি জায়েজ?
তৃতীয় অবস্থা
চুমু খাওয়ার ফলে বীর্যপাত বা সহবাস হয়ে যায়।
এই ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যাবে। যদি সহবাস হয়, তবে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে। আর শুধু বীর্যপাত হলে কাজা ওয়াজিব হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“রোজা ঢালস্বরূপ। তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং উত্তেজনামূলক কাজে লিপ্ত না হয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিস প্রমাণ করে, রোজার সময় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত যা মানুষকে কামনার দিকে নিয়ে যায়।
রোজার একটি বড় শিক্ষা হলো নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। শুধু স্ত্রীকে চুমু খাওয়া নয়, বরং দৃষ্টি, চিন্তা ও কল্পনাকেও সংযত করা।
রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু খাওয়া শরিয়তসম্মতভাবে সম্পূর্ণ হারাম নয়; বরং নবী (সা.) নিজে তা করেছেন—এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
তবে তিনি ছিলেন সর্বাধিক সংযমী। আমাদের জন্য শিক্ষা হলো, নিজের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
যদি আশঙ্কা থাকে যে এতে কামনা জাগ্রত হবে এবং রোজা ভঙ্গের দিকে চলে যাবে, তবে তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিবের কাছাকাছি দায়িত্ব।
রমজান মাস আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার মাস। তাই নিরাপদ পথ হলো—রোজা অবস্থায় এমন কাজ এড়িয়ে চলা, যা রোজার পবিত্রতা ও আত্মসংযমের পরিপন্থী।
মন্তব্য করুন

