বৃহস্পতিবার
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা অবস্থায় জিবরাঈল (আঃ) এর হাদিস ও রোজার শিক্ষা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও গুনাহ মাফের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

এই মাসের গুরুত্ব ও রোজার শিক্ষা বোঝাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিবরাঈল (আ.) একটি বিশেষ দোয়া ও সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছিলেন, যা হাদিসে অত্যন্ত শক্ত ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।

এ হাদিসকে অনেক আলেম “জিবরাঈল (আ.)-এর বদদোয়ার হাদিস” নামে উল্লেখ করেছেন। এতে রোজার শিক্ষা ও রমজানের মর্যাদা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে নখ কামড়ালে কি রোজা মাকরুহ হয়?

জিবরাঈল (আ.)-এর হাদিসের বর্ণনা

হজরত কা‘ব ইবনু উজরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আমি মিম্বরে উঠছিলাম। প্রথম ধাপে উঠেই বললাম: আমিন। দ্বিতীয় ধাপে উঠেও বললাম: আমিন। তৃতীয় ধাপে উঠেও বললাম: আমিন।

সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আজ এমন কিছু বললেন যা আগে বলেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন,

জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে এসে বললেন—

১. ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, যে রমজান মাস পেল, অথচ তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি বললাম: আমিন।

২. ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, যার কাছে আপনার নাম উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে আপনার ওপর দরুদ পাঠ করল না। আমি বললাম: আমিন।

৩. ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতাকে বা তাদের একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল, অথচ তাদের মাধ্যমে জান্নাতে যেতে পারল না। আমি বললাম: আমিন।” (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজি, হাকিম)

এই হাদিসে জিবরাঈল (আ.)-এর তিনটি দোয়া এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমিন বলা প্রমাণ করে যে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুতর।

প্রথম দোয়া: রমজান পেয়েও গুনাহ মাফ না হওয়া

এই হাদিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো— “ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি, যে রমজান পেল অথচ তার গুনাহ মাফ হলো না।”

এ থেকে বোঝা যায়, রমজান এমন এক বরকতময় মাস যেখানে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমার দরজা খুলে দেন।

আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় চোখের লেন্স পরা যাবে কি?

যে ব্যক্তি রোজা, নামাজ, তওবা ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন না করে, সে প্রকৃতপক্ষে বড় ক্ষতির মধ্যে পড়ে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস প্রমাণ করে, রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু না খাওয়া নয়; বরং গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া ও তাকওয়া অর্জন।

রোজার শিক্ষা: তাকওয়া ও আত্মসংযম

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)

জিবরাঈল (আ.)-এর হাদিস আমাদের শেখায়, রোজা এমন এক ইবাদত যার মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযম শিখে। চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরকে গুনাহ থেকে বাঁচানোই রোজার আসল শিক্ষা।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, আল্লাহ তার শুধু পানাহার ত্যাগের কোনো প্রয়োজন রাখেন না।” (সহিহ বুখারি)

এ হাদিসে বোঝা যায়, রোজা কবুল হওয়ার জন্য চরিত্র সংশোধন অপরিহার্য। রমজান অবহেলা করার পরিণতি

জিবরাঈল (আ.) বলেছেন, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যে রমজান পেয়েও ক্ষমা পায় না। অর্থাৎ রমজান অবহেলা করা আল্লাহর রহমত থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার শামিল।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।” (সহিহ মুসলিম)

আরও পড়ুনঃ রোজা রেখে মাথা ব্যথা হলে বাম বা মলম লাগানো যাবে কি?

যখন রহমতের দরজা খোলা থাকে, তখনও যদি কেউ গুনাহ থেকে ফিরে না আসে, তবে সে বড় দুর্ভাগা।

রোজার শিক্ষা: দরুদ ও বাবা-মায়ের হক

এই হাদিসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশও রোজার শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

রমজান শুধু রোজা নয়; বরং দরুদ পাঠ, বাবা-মায়ের খেদমত ও নেক আমল বৃদ্ধির মাস। যে ব্যক্তি এগুলো অবহেলা করে, সে রোজার প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

জিবরাঈল (আ.)-এর এই হাদিস আমাদের স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়, রমজান মাস পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়, কিন্তু এই মাস পেয়েও যদি গুনাহ মাফ না করানো যায়,

তবে তা চরম দুর্ভাগ্য। রোজার শিক্ষা হলো তাকওয়া, আত্মসংযম, তওবা, দরুদ পাঠ এবং বাবা-মায়ের খেদমত।

এই হাদিস আমাদের জন্য সতর্কবার্তা:

রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়, বরং গুনাহ মাফের মাস। যে ব্যক্তি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে না, সে নিজেই নিজের ক্ষতি করে।

অতএব আমাদের উচিত রোজার মাধ্যমে নিজের জীবন সংশোধন করা, বেশি বেশি তওবা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা

এবং আল্লাহর রহমত অর্জনের চেষ্টা করা—যাতে আমরা সেই হতভাগাদের অন্তর্ভুক্ত না হই, যাদের সম্পর্কে জিবরাঈল (আ.) বদদোয়া করেছেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X