বৃহস্পতিবার
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭ ফাল্গুন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও মোনাজাত

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের মাস। এই মাসের প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি। রমজানের রাতগুলোকে সজীব ও প্রাণবন্ত করতে তারাবির নামাজের কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু একটি নামাজই নয়, বরং দীর্ঘ এক মাস ধরে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য উপায়। তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, যা পুরুষ এবং নারী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনভর রোজা রাখার পর রাতের বেলা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আল্লাহর কালাম শোনা বা পাঠ করা মুমিনের হৃদয়ে এক বিশেষ প্রশান্তি বয়ে আনে। সঠিক নিয়মে এই নামাজ আদায় করা এবং এর দোয়াগুলো জানা থাকলে ইবাদতে একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

তারাবির নামাজের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়াম বা তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে" (সহিহ বুখারি)। এটি একটি বিশেষ সুযোগ যা বছরে কেবল একবারই আসে। তারাবির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন খতম করার সুযোগ হয়, যাকে আমরা 'খতম তারাবি' বলে থাকি। আবার যারা হাফেজ নন, তারা ছোট ছোট সুরা দিয়েও এই নামাজ আদায় করতে পারেন, যাকে 'সুরা তারাবি' বলা হয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার মাধ্যমে ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক দারুণ পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ হয় এই মাসে।

তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা ও সময়

তারাবির নামাজ এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় আদায় করা যায়। তবে সাধারণত এশার ফরয ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে এটি পড়া হয়। রাকাত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও হানাফি মাযহাব এবং মক্কা-মদিনার হারামাইন শরীফাইনের দীর্ঘদিনের আমল অনুযায়ী ২০ রাকাত তারাবি পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটি প্রতি দুই রাকাত পরপর সালাম ফিরিয়ে আদায় করতে হয়। অর্থাৎ মোট ১০টি সালামের মাধ্যমে ২০ রাকাত পূর্ণ হয়। তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়া উত্তম, তবে কোনো কারণে মসজিদে যেতে না পারলে একা একাও ঘরে পড়া যায়।

তারাবির নামাজের নিয়ত: আরবি ও বাংলা

যেকোনো ইবাদতের প্রাণ হলো নিয়ত। নিয়ত মানে হলো মনের সংকল্প। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে মনের একাগ্রতার জন্য অনেকে উচ্চারণ করে থাকেন। তারাবির নামাজের নিয়ত আরবিতে এভাবে করা যেতে পারে:

আরবি নিয়ত

نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلّٰهِ تَعَالَى رَكْعَتَىْ صَلٰوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللّٰهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلٰى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اَللّٰهُ اَكْبَرُ

বাংলা উচ্চারণ: "নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাাহি তা'আলা রাকাআতাই সালাতিত তারাবীহি সুন্নাতু রাসুলিল্লাাহি তা'আলা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা'বাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।"

বাংলা অর্থ: "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কিবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবির সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামাজ আদায়ের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।"

তারাবির নামাজের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম

তারাবির নামাজ আদায়ের পদ্ধতি অন্যান্য সাধারণ সুন্নাত বা নফল নামাজের মতোই। প্রথমে তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধতে হয়। এরপর সানা, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়ে সুরা ফাতেহার সাথে অন্য একটি সুরা মেলাতে হয়। রুকু ও সিজদা শেষ করে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াতে হয়। দ্বিতীয় রাকাতেও সুরা ফাতেহা ও অন্য একটি সুরা পড়ে রুকু-সিজদা শেষে আত্তাহিয়াতু, দুরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরাতে হয়। এভাবে দুই রাকাত করে মোট ২০ রাকাত নামাজ পড়তে হয়। প্রতি চার রাকাত পর পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া মুস্তাহাব। এই বিরতির সময় তাসবিহ পাঠ করা বা জিকির করা যায়।

প্রতি চার রাকাত পর পর পড়ার তাসবিহ

তারাবির নামাজের প্রতি চার রাকাত শেষ হওয়ার পর যে তাসবিহটি আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত, তা অত্যন্ত অর্থবহ। যদিও এটি নির্দিষ্টভাবে পড়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর শব্দগুলো আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা প্রকাশ করে।

আরবি তাসবিহ:

سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظَمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِي لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوتُ سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّنَا وَرَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ

বাংলা উচ্চারণ: "সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা যিল ইযযাতি ওয়াল আযমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল জাবারুত। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাযি লা ইয়ানামু ওয়ালা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।"

বাংলা অর্থ: "পবিত্র সেই মহান আল্লাহ, যিনি দৃশ্য ও অদৃশ্য জগতের মালিক। পবিত্র সেই সত্তা, যিনি ইজ্জত, মহত্ত্ব, ভয় ও ক্ষমতার অধিকারী। পবিত্র সেই চিরঞ্জীব মালিক, যিনি ঘুমান না এবং যার মৃত্যু নেই। তিনি পবিত্র এবং অতি পবিত্র, আমাদের প্রতিপালক এবং ফেরেশতা ও রূহ (জিবরাইল আ.)-এর প্রতিপালক।"

তারাবির নামাজের বিশেষ মোনাজাত

তারাবির ২০ রাকাত পূর্ণ হওয়ার পর মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও কবুলিয়াতের জন্য দোয়া করা হয়। এই মোনাজাতটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং এতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের প্রার্থনা করা হয়।

আরবি মোনাজাত: اَللّٰهُمَّ اِنَّا نَسْئَلُكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ ، يَا خَالِقَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ ، بِرَحْمَتِكَ يَا عَزِيْزُ يَا غَفَّارُ ، يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ ، يَا رَحِيْمُ يَا جَبَّارُ ، يَا خَالِقُ يَا بَارُّ ، اَللّٰهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ ، يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ ، بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ

বাংলা উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান নার। ইয়া খালিকাল জান্নাতি ওয়ান নার, বিরাহমাতিকা ইয়া আযিযূ ইয়া গাফফার, ইয়া কারীমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহীমু ইয়া জাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বারর। আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার, ইয়া মুজিরু ইয়া মুজিরু ইয়া মুজির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।"

বাংলা অর্থ: "হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাচ্ছি। হে জান্নাত ও জাহান্নামের স্রষ্টা! আপনার রহমতের উসিলায় আমাদের মুক্তি দিন, হে শক্তিশালী, হে ক্ষমাশীল, হে দয়ালু, হে দোষ গোপনকারী, হে করুণাময়, হে পরাক্রমশালী। হে আল্লাহ! আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। হে রক্ষাকারী, হে রক্ষাকারী, হে রক্ষাকারী। আপনার দয়ার উসিলায়, হে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।"

তারাবির নামাজে সুরা ও কিরাতের গুরুত্ব

যারা হাফেজে কুরআন নন, তারা সাধারণ সুরা দিয়ে তারাবি পড়লে একে 'সুরা তারাবি' বলা হয়। সাধারণত সুরা ফীল থেকে সুরা নাস পর্যন্ত শেষ ১০টি সুরা দিয়ে দুইবার করে ২০ রাকাত আদায় করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, তাড়াহুড়ো করে নামাজ পড়া মোটেও উচিত নয়। তারাবি শব্দের অর্থই হলো 'বিশ্রাম নেওয়া' বা 'ধীরস্থিরভাবে পড়া'। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর যেন স্পষ্ট উচ্চারিত হয় এবং রুকু-সিজদা যেন যথাযথভাবে আদায় হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। অনেক সময় হাফেজ সাহেবরা দ্রুত কুরআন খতম করার প্রতিযোগিতায় নেমে যান, যা নামাজের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে। ধীরস্থিরভাবে তিলাওয়াত করা এবং তিলাওয়াতের মাধুর্য বজায় রাখা নামাজের সওয়াব ও একাগ্রতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।

নারীদের তারাবির নামাজের নিয়ম

নারীদের জন্য তারাবির নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। নারীরা ঘরে একাকী এই নামাজ আদায় করবেন। তাদের নামাজের নিয়ম পুরুষদের মতোই, তবে পর্দার বিধান এবং সিজদার ধরনে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে যা সাধারণ নামাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক সময় বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য মসজিদে আলাদা জামাতের ব্যবস্থা থাকে, সেখানে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে ঘরে একা পড়াই তাদের জন্য অধিকতর উত্তম ও নিরাপদ। নারীরাও ২০ রাকাত তারাবি আদায় করবেন এবং প্রতি চার রাকাত পর পর উল্লেখিত তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করবেন।

ইবাদতের মাসে নিজেকে সঁপে দেওয়া

তারাবির নামাজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আত্মার খোরাক। দীর্ঘ সময় ইবাদতে মগ্ন থাকার মাধ্যমে মানুষের মনে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি তৈরি হয়। রমজানের এই বিশেষ রাতে যখন পুরো বিশ্ব ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন মুমিন বান্দা তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারাবির নিয়ম, নিয়ত ও মোনাজাত সঠিকভাবে জেনে নিয়ে ইবাদত করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আসুন, আমরা এই রমজানে অবহেলা না করে নিয়মিত ২০ রাকাত তারাবি পড়ার চেষ্টা করি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সবার সিয়াম ও কিয়াম কবুল করুন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X