

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইসলামে রোজা ফরজ ইবাদত হলেও আল্লাহ তাআলা বান্দার সক্ষমতা ও বাস্তব অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। গর্ভবতী ও বুকের দুধ পান করানো মায়েদের ক্ষেত্রে শরিয়তে বিশেষ সহজ বিধান রয়েছে।
অনেক মায়ের মনে প্রশ্ন আসে—যদি তিনি সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান, তাহলে কি রোজা রাখা তার জন্য ফরজ হবে, নাকি তিনি রোজা না রাখার অনুমতি পাবেন? কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো দায়িত্ব দেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)।
আবার অন্য আয়াতে বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ হবে বা সফরে থাকবে, সে অন্য সময়ে সমান সংখ্যক দিন রোজা পূরণ করবে।” (সূরা বাকারা: ১৮৫)।
আরও পড়ুনঃ জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া।
আলেমগণ বলেন, বুকের দুধ খাওয়ানো মা-ও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত, যদি রোজা রাখলে তার নিজের শরীর দুর্বল হয়ে যায় বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ মুসাফিরের কাছ থেকে অর্ধেক নামাজ এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীর কাছ থেকে রোজা তুলে নিয়েছেন।” (তিরমিজি, আবু দাউদ)।
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, বুকের দুধ খাওয়ানো মা যদি কষ্ট বা ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তিনি রোজা না রাখার অনুমতি পাবেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সহজ বিধান।
যদি কোনো মা মনে করেন যে, রোজা রাখলেও তার শরীরের ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না এবং দুধের পরিমাণ কমবে না, তাহলে তার জন্য রোজা রাখা জায়েজ এবং অনেক আলেমের মতে উত্তম।
কারণ তখন সে পূর্ণ সুস্থ ও সক্ষম হিসেবে গণ্য হবে। তবে যদি রোজা রাখার কারণে দুধ কমে যায়, শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, বা মা নিজে অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য রোজা না রাখা বৈধ। এতে কোনো গুনাহ হবে না।
আরও পড়ুনঃ মৃত্যুর পর কবরের আজাব থেকে মুক্তির দোয়া।
এ ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে, বুকের দুধ খাওয়ানো মা যদি রোজা না রাখেন, তাহলে পরে শুধু কাজা রোজা আদায় করবেন।
অর্থাৎ রমজান শেষে অন্য সময়ে সমান সংখ্যক রোজা রেখে নেবেন। আবার কিছু আলেম বলেছেন, যদি মা শুধু সন্তানের ক্ষতির ভয়ে রোজা না রাখেন, তবে কাজার পাশাপাশি ফিদইয়া (একজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া) আদায় করবেন।
তবে শক্তিশালী মত হলো—শুধু কাজা রোজাই যথেষ্ট, কারণ হাদিসে কাফফারা বা ফিদইয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমাদের হায়েজ হতো, তখন রোজার কাজা করতে বলা হতো, কিন্তু নামাজের কাজা করতে বলা হতো না।” (সহিহ মুসলিম)। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শরিয়তে রোজার কাজা গুরুত্বপূর্ণ।
বুকের দুধ খাওয়ানো মা-ও যখন শরিয়তসম্মত কারণে রোজা রাখেন না, তখন তার ওপর কাজা আদায় করা ফরজ হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সিদ্ধান্ত আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব অবস্থা ও প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় মাসিক বা পিরিয়ড শুরু হলে করণীয় কী?
যদি অভিজ্ঞ ডাক্তার বলেন যে, রোজা রাখলে মা বা শিশুর ক্ষতি হবে, তবে রোজা না রাখাই শরিয়তসম্মত ও বুদ্ধিমানের কাজ। ইসলাম কখনো মানুষের ক্ষতি চায় না।
রমজানে যারা রোজা রাখতে পারবেন না, তারা যেন হতাশ না হন। কারণ রোজা ছাড়াও আল্লাহর কাছে নেকি অর্জনের অনেক পথ রয়েছে।
দোয়া, জিকির, দরুদ শরিফ, ইস্তেগফার, কুরআন তিলাওয়াত (মুখে স্পর্শ ছাড়া), সদকা ও নেক কাজের মাধ্যমে তারা রমজানের ফজিলত অর্জন করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর রহমত নেককারদের নিকটবর্তী।” (সূরা আরাফ: ৫৬)।
সবশেষে বলা যায়, বুকের দুধ খাওয়ানো মা যদি সুস্থ থাকেন এবং রোজা রাখলে তার বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তাহলে রোজা রাখা জায়েজ ও উত্তম।
কিন্তু যদি রোজা রাখলে দুধ কমে যায় বা শিশু ও মায়ের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তবে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে।
এতে কোনো গুনাহ নেই, বরং এটি আল্লাহর দেওয়া সহজ বিধান। ইসলাম মায়ের দায়িত্ব ও সন্তানের হককে গুরুত্ব দেয় এবং উভয়ের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দেয়।
মন্তব্য করুন

