

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাস একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এই মাসে যেমন দিনের রোজা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাতের আমলও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ঘুমানোর আগের সময়টি এমন এক মুহূর্ত, যখন বান্দা সারা দিনের রোজা ও ইবাদতের পর আল্লাহর কাছে নিজের হিসাব পেশ করতে পারে।
কুরআন ও সহিহ হাদিসে ঘুমানোর আগে কিছু নির্দিষ্ট আমল ও দোয়ার নির্দেশনা এসেছে, যা রোজাদারের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ।
ঘুমানোর আগে প্রথম যে আমলটির কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে বলেছেন, তা হলো ওজু করে শোয়া। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবীজি বলেছেন, “তুমি যখন বিছানায় যাওয়ার ইচ্ছা করবে, তখন নামাজের জন্য যেমন ওজু করো, তেমন ওজু করে নেবে।”
আলেমগণ বলেন, ওজু অবস্থায় ঘুমালে যদি ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু হয়, তবে সে ব্যক্তি ইবাদতের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে। রোজাদারের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সে সারাদিন সংযম ও তাকওয়ার সঙ্গে কাটানোর পর পবিত্র অবস্থায় রাতের বিশ্রাম নেয়।
আরও পড়ুনঃ ইতেকাফে বসার দোয়া ও মসজিদে প্রবেশের নিয়ম।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর আগে তাওবা ও ইস্তিগফার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।” রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন, আর তাকওয়ার একটি বড় অংশ হলো নিজের গুনাহ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
নবীজি নিজে দিনে সত্তর থেকে একশবার পর্যন্ত ইস্তিগফার করতেন, যা সহিহ বুখারিতে প্রমাণিত। রোজাদার যদি ঘুমানোর আগে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলে দিনের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চায়, তবে তা তার রোজাকে আরও পূর্ণতা দেয়।
ঘুমানোর আগে কুরআন তিলাওয়াতের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে আয়াতুল কুরসি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
যে ব্যক্তি ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়ে, আল্লাহ তার জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেন, যে তাকে সকাল পর্যন্ত শয়তান থেকে হেফাজত করে। রোজাদারের জন্য এটি বিশেষ সুরক্ষা, কারণ শয়তান রোজাদারকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আয়াতুল কুরসি আল্লাহর ক্ষমতা ও তাওহিদের ঘোষণা হওয়ায় এটি ঈমানকে দৃঢ় করে।
আরও পড়ুনঃ রমজানে সকাল-সন্ধ্যার জিকির ও দোয়া: একটি কমপ্লিট রুটিন।
এছাড়াও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়তেন। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে, নবীজি এই তিনটি সূরা পড়ে নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীর মুছে নিতেন।
এই আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে জিন, শয়তান ও অদৃশ্য অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। রোজাদার যখন সারাদিন নিজেকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখে, তখন এই সূরাগুলো পড়ে ঘুমালে তার রাতও নিরাপদ হয়।
ঘুমানোর আগে যে দোয়াটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত পড়তেন, তা হলো “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।” সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এই দোয়াটির মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে নেয় যে তার জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। রোজাদারের জন্য এই দোয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি তাকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অহংকার থেকে দূরে রাখে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলো ঘুমানোর আগে তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ এবং চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার পড়া। এই আমলটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন,
আরও পড়ুনঃ রোজা অবস্থায় বেশি বেশি পড়ার জন্য ৫টি ছোট ও সহজ জিকির।
যা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত। আলেমদের মতে, এই জিকির শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবং অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়, যা রোজাদারের জন্য বিশেষ উপকারী।
সবশেষে, ঘুমানোর আগে পরদিন রোজা রাখার নিয়ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও রমজানের ফরজ রোজার নিয়ত মনে মনে করলেই যথেষ্ট, তবুও ঘুমানোর আগে অন্তরে এই সংকল্প করা যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রোজা রাখব, এটি ঈমানকে শক্তিশালী করে। নিয়তসহ ঘুমালে সেই ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়।
তাই বলা যায়, ঘুমানোর আগে রোজাদারের বিশেষ আমল ও দোয়া কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা সুপ্রমাণিত। ওজু, ইস্তিগফার, আয়াতুল কুরসি, তিন কুল, সুন্নতি দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে একজন রোজাদার তার রাতকে নিরাপদ ও বরকতপূর্ণ করতে পারে।
রমজানের পবিত্র রাতগুলো যদি এই আমলগুলোর মাধ্যমে অতিবাহিত করা যায়, তবে রোজা শুধু দিনের ইবাদত না হয়ে দিন ও রাতব্যাপী একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদতে পরিণত হবে।
মন্তব্য করুন

