মঙ্গলবার
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নোয়াখালী-৪

পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি; শক্তি জানান দিতে প্রস্তুত জামায়াত

আরিফ সবুজ, নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
বাঁয়ে মোঃ শাহজাহান ও ইসহাক খন্দকার
expand
বাঁয়ে মোঃ শাহজাহান ও ইসহাক খন্দকার

নোয়াখালী-৪ সংসদীয় আসন (২৭১ নং) নোয়াখালী-৪ সংসদীয় আসন (নোয়াখালী সদর ও সুবর্ণচর উপজেলা নিয়ে গঠিত ২৭১ নম্বর আসন) মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা পলিমাটির সুবর্ণচর এবং জেলা সদর মাইজদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

এই আসনটি ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপি এ আসনটি প্রথম দখল করে।

এরপর টানা চারবার (১৯৯১, ১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ জুন এবং ২০০১) মোহাম্মদ শাহজাহান এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯১)

এ আসনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ ১১টি দল অংশ নেয়। ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিএনপির মোঃ শাহজাহান ৩৩,৩৩৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের গোলাম মহি উদ্দিন লাতু ২৯,২৬১ ভোট পান।

জামায়াতের ডা. বোরহান উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১৬,২১৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। বিএনপি ৩৬.২% এবং জামায়াত ১৭.৬% ভোট পায়। এখান থেকেই জামায়াতের অবস্থান শক্তিশালী হতে শুরু করে।

ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬ ফেব্রুয়ারি)

স্বল্পমেয়াদি সরকারের (৪ কার্যদিবসের ১২ দিনের) নির্বাচনে মোঃ শাহজাহান আবার বিজয়ী হন। বিএনপি ২৭৮টি আসন পায় (মোট ৩০০-এর মধ্যে), ফ্রিডম পার্টি ১টি, স্বতন্ত্র ১০টি; ১০টি আসনের ফল অসমাপ্ত থাকে।

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৯৯৬ জুন)

বিএনপির মোঃ শাহজাহান হ্যাটট্রিক করেন। বিএনপি ৪৫.৯% ভোট পায়, আওয়ামী লীগের অধ্যাপক খায়রুল আনম সেলিম ৩৯.৮% পান। জামায়াতের ডা. বোরহান উদ্দিনের ভোট কমে ৮.২%-এ নেমে আসে।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১)

জামায়াত প্রার্থী না দিলে বিএনপির মোঃ শাহজাহান টানা চতুর্থবার জয়ী হন। তিনি ১,১২,০৯৫ ভোট পান, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের গোলাম মহিউদ্দিন লাতু ৮৩,৯৯৮ ভোট পান। জাতীয় পার্টির ভাঙনের সুবিধা বিএনপি পায়।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০৮)

এ আসনে গদি বদল হয়। আওয়ামী লীগের একরামুল করিম চৌধুরী (কবিরহাটের) বিএনপির হেভিওয়েট মোঃ শাহজাহানকে পরাজিত করেন। মোট ভোট ২,৮৬,১৪৫-এর মধ্যে একরামুল ১,৩১,৭০৬ ভোট পান। বিএনপি থেকে বেরিয়ে মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান বিকল্প ধারায় দাঁড়িয়ে ভোটের সমীকরণ বদলে দেন (৪.৪% বেশি ভোট কেড়ে নেন)।

দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪)

বিরোধী দলগুলো (বিএনপি-জামায়াতসহ) নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা একতরফা জয়ী হন। তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে উপজেলা চেয়ারম্যান বানান। ২০১৮-এ বিএনপির মোঃ শাহজাহান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

৫ আগস্ট ২০২৪-এ গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়, অনেক এমপি-মন্ত্রী গা-ঢাকা দেন বা দেশ ছাড়েন। নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নেই। দেড় যুগের মিত্র বিএনপি-জামায়াত আবার লড়ছে।

বিএনপির প্রার্থী মোঃ শাহজাহান (সাবেক এমপি, দলের ভাইস চেয়ারম্যান)। জামায়াত প্রার্থী পরিবর্তন করে জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকারকে (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) মনোনয়ন দিয়েছে।

জামায়াতের বার্তা

সুবর্ণচর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা জামাল উদ্দিন এনপিবিকে বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। লাঙ্গল, নৌকা, ধানের শীষ দেখেছে; এবার দাঁড়িপাল্লার শাসন দেখতে চায়। জনপ্রিয়তা বেড়েছে, ১৯৯১-এ ১৭.৬% থেকে এবার ৫০%-এর বেশি ভোট পাব ইনশাআল্লাহ।

সদর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ডা. মিরাজুল ইসলাম এনপিবিকে বলেন, আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভোট পাব। ধৈর্যের সাথে মোকাবিলা করব, জনগণের পাশে থাকব। ১০ দলীয় জোটে শক্ত অবস্থানে আছি।

বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি

সুবর্ণচর ও সদরের একাধিক নেতা জানান, বিপুল ভোটে আসন পুনরুদ্ধার করব। অঙ্গ সংগঠনগুলোতে নেতাকর্মীর তৃণমূল জনসম্পৃক্ততা রয়েছে। জেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র এ আসন ফিরে পেতে সবাই ঐক্যবদ্ধ।

বিএনপি প্রার্থী মোঃ শাহজাহান পুত্র আবু সালেহ মোঃ আব্দুল্লাহ সবুজ এনপিবিকে বলেন, আমাদের শতভাগ্য চেষ্টা চলমান৷ আমাদের ভোটের কার্যক্রম ও চলমান৷ ভোটারদের ধারে ধারে আমরা যাচ্ছি।আমরা আশা করি এটা বিএনপির ঘাঁটিতে পরিণত হবে৷ এটা ভোটাররা প্রমাণ করে দেবে৷

সাম্প্রতিক ঘটনা, জোট প্রেক্ষাপট ও ভোটের প্রভাব: বিএনপি-জামায়াত ১০ দলীয় জোটে একসাথে লড়ছে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল লড়াই এ দুই দলের মধ্যে৷ সুবর্ণচরের চরাঞ্চল ও সদরের শহুরে এলাকায় ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, যা জামায়াতের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

এ আসনে ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির দখল থাকলেও জামায়াতের ভোটব্যাংক এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারে৷ ২০২৪-এর পরিবর্তনের পর এ আসনে বিএনপির পুরনো শক্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা, জামায়াতের সক্রিয় প্রচারণা (যেমন মোটরসাইকেল শোডাউন)।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X