

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসের রাতগুলো মুসলমানদের জন্য ইবাদতে পরিপূর্ণ এক বিশেষ সময়। এই মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। সাধারণত মসজিদে জামাতে তারাবি আদায় করা হয় এবং নামাজ শেষে একটি দীর্ঘ মোনাজাত পড়ার প্রচলন দেখা যায়।
এ কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—যদি কেউ একা তারাবির নামাজ পড়ে, তাহলে কি তার জন্য মোনাজাত করা জরুরি? মোনাজাত না করলে কি তারাবির নামাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হলে তারাবি ও মোনাজাত—উভয়টির শরয়ি অবস্থান পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন।
প্রথমে তারাবির নামাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে জানা দরকার। তারাবির নামাজ হলো রমজানের রাতে এশার নামাজের পর আদায়যোগ্য একটি সুন্নতে মুআক্কাদা ইবাদত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তারাবি আদায় করেছেন এবং সাহাবিদেরও উৎসাহ দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ নাজাতের ১০ দিন: জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া (আল্লাহুম্মা আজিরনা...)।
তবে তিনি নিয়মিত জামাতে পড়াকে ফরজের মতো বাধ্যতামূলক করেননি, যাতে উম্মতের ওপর কষ্ট না হয়। সহিহ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এই ফজিলত তারাবির মূল উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে দেয়।
অন্যদিকে মোনাজাত বলতে বোঝায় আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে দোয়া করা। ইসলামে দোয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” দোয়া যেকোনো সময়, যেকোনো ভাষায় করা যায় এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট নামাজের অপরিহার্য অংশ নয়, যদি না শরিয়ত তা নির্ধারণ করে দেয়। ফরজ বা সুন্নত নামাজের সঙ্গে দোয়া করা মুস্তাহাব হলেও, সেটিকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
তারাবির নামাজের শেষে যে মোনাজাতটি জামাতে করা হয়, তা মূলত একটি সামাজিক ও প্রচলিত আমল। এটি কুরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা তারাবির অংশ হিসেবে নির্ধারিত নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বা সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, তারা প্রতিদিন তারাবির পর সম্মিলিত মোনাজাত করতেন। বরং এটি পরবর্তী সময়ে মুসলমান সমাজে চালু হয়েছে, যাতে সবাই একসঙ্গে দোয়ার মাধ্যমে রমজানের বরকত কামনা করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখার দোয়া: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ।
এই কারণে একা তারাবির নামাজ পড়লে মোনাজাত করা জরুরি নয়। কেউ যদি একা তারাবি পড়ে এবং নামাজ শেষ করে কোনো মোনাজাত না করে, তাহলে তার নামাজ সম্পূর্ণ সহিহ ও পূর্ণ হবে। মোনাজাত না করলে তারাবির কোনো সওয়াব কমে যায় না এবং নামাজে কোনো ঘাটতিও তৈরি হয় না। কারণ তারাবির মূল আমল হলো নামাজ আদায় করা, দোয়া নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, একা নামাজ পড়লে দোয়া করা যাবে না বা করা উচিত নয়। বরং দোয়া করা সবসময়ই উত্তম। একা তারাবির নামাজ শেষে কেউ চাইলে হাত তুলে মোনাজাত করতে পারে, আবার কেউ চাইলে মনে মনে দোয়া করতে পারে, অথবা ফরজ ও সুন্নত নামাজের পর যেভাবে সংক্ষিপ্ত দোয়া পড়ে, সেভাবেও দোয়া করতে পারে। শরিয়তের দৃষ্টিতে এসবের সবই জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো আমলকে তখনই জরুরি বলা যায়, যখন কুরআন ও সহিহ হাদিসে তার স্পষ্ট নির্দেশ থাকে। যেহেতু তারাবির মোনাজাত সম্পর্কে এমন কোনো নির্দেশ নেই, তাই এটিকে আবশ্যক মনে করা সঠিক নয়। আলেমরা বলেন, কোনো নফল আমলকে যদি সুন্নত বা জরুরি মনে করে চাপ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।
আরও পড়ুনঃ তারাবির নামাজের মাঝখানের বিরতির দোয়া (সুবহানা যিল মুলকি...): এটি কি পড়তেই হবে?
আরও একটি দিক হলো, একা নামাজ পড়লে দোয়ার ক্ষেত্রে একজন বান্দা বেশি একাগ্র হতে পারে। কারণ তখন সে নিজের ভাষায়, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে কথা বলতে পারে। অনেক সময় নিরিবিলিতে করা দোয়া আল্লাহর কাছে বেশি কবুল হয় বলে হাদিসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই একা তারাবি আদায়কারী ব্যক্তি চাইলে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের গুনাহ মাফ, হেদায়েত ও নাজাতের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, তারাবির মোনাজাত একা নামাজ পড়লে করা জরুরি নয় এবং এটি তারাবির অপরিহার্য অংশও নয়। মোনাজাত করা একটি নফল ও কল্যাণকর আমল, কিন্তু তা না করলেও তারাবির নামাজ পূর্ণ ও সহিহ থাকে।
একজন মুমিনের জন্য উত্তম হলো—নামাজকে গুরুত্ব দেওয়া, খুশু-খুযুর সঙ্গে তারাবি আদায় করা এবং সুযোগ অনুযায়ী আল্লাহর কাছে দোয়া করা। ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই শরিয়তের মূল শিক্ষা।
মন্তব্য করুন

