মঙ্গলবার
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারাবির নামাজের মাঝখানের বিরতির দোয়া (সুবহানা যিল মুলকি…): এটি কি পড়তেই হবে?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩১ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। এশার ফরজ নামাজের পর জামাতে এই নামাজ আদায় করা হয় এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকেই এটি উম্মতের মধ্যে প্রচলিত। তারাবির নামাজ সাধারণত দুই রাকাআত করে আদায় করা হয় এবং দীর্ঘ কিরাআতের কারণে কিছু সময় পরপর বিরতি নেওয়া হয়।

এই বিরতির সময় বহু মসজিদে একটি নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা হয়, যা সাধারণভাবে “সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুত…” নামে পরিচিত। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এই দোয়াটি কি অবশ্যই পড়তে হবে, না পড়লে কি তারাবির নামাজের কোনো সমস্যা হয়?

প্রথমেই জানা দরকার, তারাবির নামাজের মাঝখানের এই বিরতির দোয়া কুরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নত হিসেবে নির্ধারিত নয়। বরং এটি মূলত একটি নফল জিকির বা দোয়া, যা পরবর্তী যুগে মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে। তারাবি শব্দটির অর্থই হলো বিশ্রাম নেওয়া।

আরও পড়ুনঃ মাগফিরাতের ১০ দিন: গুনাহ মাফের জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়া কোনটি?

অর্থাৎ, দীর্ঘ কিরাআতের কারণে নামাজের মাঝে একটু বিশ্রাম নেওয়াই এই বিরতির মূল উদ্দেশ্য। এই বিরতির সময় কেউ বসে থাকতে পারে, কেউ তাসবিহ-তাহলিল পড়তে পারে, আবার কেউ নীরবে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকতে পারে।

যে দোয়াটি সাধারণভাবে পড়া হয়, তার আরবি মূল অংশ হলো—“সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুত, সুবহানা জিল ইজ্জাতি ওয়াল আজামাতি ওয়াল হাইবাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়া ওয়াল জাবারুত।” এই দোয়ার অর্থ হলো—আমি পবিত্রতা ঘোষণা করছি সেই আল্লাহর, যিনি সার্বভৌমত্ব ও মালাকুতের অধিকারী; আমি পবিত্রতা ঘোষণা করছি সেই আল্লাহর, যিনি সম্মান, মহত্ত্ব, ভয়ভীতি, ক্ষমতা, বড়ত্ব ও পরাক্রমের অধিকারী। অর্থের দিক থেকে এটি আল্লাহর মহিমা ও গুণাবলি স্মরণ করার একটি সুন্দর জিকির।

তবে ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দোয়াটি পড়া বাধ্যতামূলক নয়। চার মাযহাবের কোনো ইমামই এই দোয়াকে তারাবির অংশ হিসেবে সাব্যস্ত করেননি। হাদিসের কিতাবগুলোতেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে নির্দিষ্টভাবে এই দোয়াটি তারাবির বিরতিতে পড়ার কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই এটিকে সুন্নতে মুআক্কাদা বা সুন্নতে গায়রে মুআক্কাদা বলা যায় না।

আরও পড়ুনঃ রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখার দোয়া: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামে ইবাদতের ক্ষেত্রে নতুন কিছু আবিষ্কার করে তা আবশ্যক মনে করা সঠিক নয়। আলেমরা বলেন, কোনো আমল যদি নফল বা জিকির হিসেবে করা হয়, তাহলে তা বৈধ; কিন্তু যদি সেটিকে অপরিহার্য মনে করা হয় বা না পড়লে নামাজ অসম্পূর্ণ মনে করা হয়, তাহলে তা ভুল ধারণার মধ্যে পড়ে। তারাবির মাঝখানের বিরতির দোয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি পড়া জায়েজ, কিন্তু না পড়লেও তারাবির নামাজ সহিহ ও পূর্ণ হয়।

আরও পড়ুনঃ নাজাতের ১০ দিন: জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া (আল্লাহুম্মা আজিরনা...)।

অনেক আলেম এই দোয়াটি পড়াকে অনুমোদন দিয়েছেন এই শর্তে যে, একে সুন্নত বা জরুরি মনে করা যাবে না। কারণ এর শব্দগুলো আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবিহভিত্তিক, যা নিজেই একটি নেক আমল। তবে কেউ চাইলে এই বিরতির সময় কুরআনের আয়াত, দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার বা নিজের ভাষায় দোয়া পড়তেও পারে। এগুলো সবই শরিয়তসম্মত এবং তারাবির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

আরেকটি দিক হলো জামাতে পড়ার বিষয়টি। অনেক মসজিদে ইমাম বা মুয়াজ্জিন উচ্চস্বরে এই দোয়া পড়েন এবং সবাই একসঙ্গে তা অনুসরণ করেন। যদি কেউ এতে অংশ না নেয় বা নীরবে বসে থাকে, তাহলে তাকে ভুলভাবে সংশোধন করা বা তিরস্কার করা উচিত নয়। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি বাধ্যতামূলক কোনো আমল নয়। ইবাদতের ক্ষেত্রে এই সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

তারাবির নামাজের মূল গুরুত্ব হলো কিয়ামুল লাইল, অর্থাৎ রাতের বেলায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে ইবাদত করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এই ফজিলত অর্জনের জন্য নামাজের খুশু-খুযু, কিরাআত শোনা এবং অন্তরের একাগ্রতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনো নির্দিষ্ট বিরতির দোয়া নয়।

সবশেষে বলা যায়, তারাবির নামাজের মাঝখানের বিরতির দোয়া “সুবহানা যিল মুলকি…” পড়া বাধ্যতামূলক নয় এবং এটি তারাবির অপরিহার্য অংশও নয়। এটি একটি নফল জিকির হিসেবে পড়া জায়েজ, তবে না পড়লেও তারাবির নামাজ সম্পূর্ণ ও সহিহ থাকে।

একজন মুমিনের জন্য উত্তম হলো—এই বিরতির সময় আল্লাহর স্মরণে থাকা, যে কোনো সহিহ জিকির বা দোয়া পড়া এবং এই মাসের বরকতপূর্ণ ইবাদতকে আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X