

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাস আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক অনন্য রহমত ও নৈকট্যের সুযোগ। ইসলামী পরিভাষায় রমজানকে তিনটি দশকে ভাগ করা হয়েছে—প্রথম দশক রহমত, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত এবং তৃতীয় দশক নাজাত। নাজাতের দশক বলতে রমজানের শেষ দশ দিনকে বোঝানো হয়, যা ২১ থেকে ৩০ রমজান পর্যন্ত বিস্তৃত।
‘নাজাত’ শব্দের অর্থ হলো মুক্তি, বিশেষ করে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করা। এই দশক একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ এই সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা দেন এবং দোয়া কবুলের দরজা আরও প্রশস্ত করে দেন।
হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রমজানের প্রথম অংশ রহমত, মাঝের অংশ মাগফিরাত এবং শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি। যদিও এই হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবে এর অর্থ কুরআন ও সহিহ হাদিসের সামগ্রিক শিক্ষা দ্বারা সমর্থিত। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা রমজানকে তাকওয়া অর্জনের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন, আর তাকওয়ার চূড়ান্ত ফল হলো জাহান্নাম থেকে নাজাত।
আরও পড়ুনঃ ইফতারের দোয়া ভুলে খেয়ে ফেললে করণীয় কী? পরে পড়া যাবে?
নাজাতের দশকের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বহুল পঠিত দোয়া হলো—“আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার।” এর অর্থ, হে আল্লাহ, আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। এই দোয়াটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ এতে বান্দা সরাসরি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় বিপদ থেকে রক্ষার আবেদন জানায়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং সাহাবিদেরও তা পড়তে উৎসাহ দিতেন।
ইসলামী আলেমদের মতে, এই দোয়াটি শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই যথেষ্ট নয়; বরং অন্তরে জাহান্নামের ভয় এবং আল্লাহর রহমতের আশা একসঙ্গে থাকতে হবে। কুরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা ভয় ও আশার মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে। নাজাতের দশকে এই ভারসাম্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, কারণ এই সময় বান্দা একদিকে নিজের গুনাহ স্মরণ করে ভয় পায়, অন্যদিকে আল্লাহর অসীম ক্ষমার ওপর ভরসা রাখে।
আরও পড়ুনঃ রহমতের ১০ দিন: প্রথম ১০ রোজার বিশেষ দোয়া ও আমল।
নাজাতের দশকের বিশেষত্ব আরও বেড়ে যায় কারণ এই সময়ের মধ্যেই রয়েছে লাইলাতুল কদর। কুরআনে বলা হয়েছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং শান্তি বিরাজ করে ফজর পর্যন্ত।
যে ব্যক্তি এই রাতে ইমান ও সওয়াবের আশায় ইবাদত করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে—এ মর্মে সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। গুনাহ মাফ হওয়ার অর্থই হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথে এক বিশাল অগ্রগতি।
নাজাতের দশকে দোয়ার উত্তম সময়গুলো হলো রাতের শেষ অংশ, তাহাজ্জুদের সময়, ফরজ নামাজের পর, সেজদার অবস্থা এবং ইফতারের আগ মুহূর্ত। বিশেষ করে শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কে আছে নাজাত চাইবে, আমি তাকে নাজাত দান করব। এই হাদিস নাজাতের দশকে দোয়ার গুরুত্বকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আরও পড়ুনঃ মাগফিরাতের ১০ দিন: গুনাহ মাফের জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়া কোনটি?
এই দশকে দোয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমলের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন, রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারকেও ইবাদতে উৎসাহিত করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা লাভ করা। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ এবং নফল নামাজ নাজাতের পথকে সহজ করে দেয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাজাত শুধু দোয়ার মাধ্যমে নয়, বরং জীবনব্যাপী গুনাহ পরিহার ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়। নাজাতের দশকে করা তাওবা ও দোয়া যদি রমজানের পরেও চরিত্র ও আচরণে প্রভাব ফেলে, তাহলেই তা প্রকৃত নাজাতে রূপ নেয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে শুদ্ধ করেছে, সেই সফলকাম হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, নাজাতের ১০ দিন একজন মুমিনের জন্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। “আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার” দোয়াটি এই দশকের মূল আবেদনকে সংক্ষেপে প্রকাশ করে। এই দোয়ার সঙ্গে আন্তরিক তাওবা, নিয়মিত ইবাদত ও তাকওয়ার চেষ্টা যুক্ত হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করা বান্দার জন্য আশার বিষয় হয়ে ওঠে।
তাই নাজাতের দশককে অবহেলা না করে এটিকে নিজের আখিরাত গঠনের শেষ ও শ্রেষ্ঠ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন সচেতন মুমিনের কর্তব্য।
মন্তব্য করুন

