

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইসলামে চাঁদ দেখার সঙ্গে ইবাদতের সময়সূচি ও গুরুত্বপূর্ণ বিধান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রমজান মাসের সূচনা, রোজা রাখা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন নির্ধারণ—সবকিছুই চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, চাঁদ মানুষদের জন্য সময় নির্ধারণের মাধ্যম।
সুরা বাকারার ১৮৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এগুলো মানুষের জন্য সময় নির্ধারণের উপায় এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।” এই আয়াত প্রমাণ করে যে চাঁদ দেখা শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়, বরং ইসলামী ইবাদতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ইবাদতসংশ্লিষ্ট বিষয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাঁদ দেখার সময় বিশেষ দোয়া পড়তেন। এই দোয়াগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে নতুন মাসকে আল্লাহর স্মরণ ও কল্যাণের দোয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। রমজান বা ঈদের চাঁদ—উভয় ক্ষেত্রেই এই দোয়াগুলোর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। চাঁদ দেখা মানে শুধু একটি নতুন মাস শুরু হওয়া নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন সুযোগ, নতুন আমল এবং নতুন দায়িত্বের সূচনা।
আরও পড়ুনঃ রহমতের ১০ দিন: প্রথম ১০ রোজার বিশেষ দোয়া ও আমল।
চাঁদ দেখার সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দোয়াটি বেশি পড়তেন, তা হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। দোয়াটি হলো: “আল্লাহু আকবার। আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম, ওয়াত তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ওয়া তারদা, রাব্বুনা ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।” এই দোয়াটি সহিহ হাদিসে এসেছে, যা তিরমিজি ও দারেমিসহ একাধিক হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।
এই দোয়ার অর্থ হলো: আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ, এই চাঁদকে আমাদের ওপর নিরাপত্তা ও ইমানসহ উদিত করুন, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন এবং এমন কাজ করার তাওফিক দিন যা আপনি ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন। আমাদের রব ও এই চাঁদের রব একমাত্র আল্লাহ।
এই দোয়াটির প্রতিটি অংশ গভীর অর্থ বহন করে। এখানে নিরাপত্তা ও ইমান চাওয়ার মাধ্যমে বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে। শান্তি ও ইসলাম চাওয়ার অর্থ হলো—এই নতুন মাস যেন ফিতনা, বিপদ ও গুনাহ থেকে মুক্ত থাকে এবং ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করে। আল্লাহর পছন্দনীয় কাজে তাওফিক চাওয়ার মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে।
রমজানের চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে এই দোয়ার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ রমজান হলো তাকওয়া অর্জনের মাস। এই মাসে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় আবেদন হলো—তিনি যেন আমাদের রোজা, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত কবুল করেন। তাই রমজানের চাঁদ দেখার সময় এই দোয়া পড়া মানে হলো, পুরো মাসটিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করার জন্য তাঁর সাহায্য কামনা করা।
আরও পড়ুনঃ মাগফিরাতের ১০ দিন: গুনাহ মাফের জন্য শ্রেষ্ঠ দোয়া কোনটি?
ঈদের চাঁদ দেখার ক্ষেত্রেও এই দোয়া পড়া সুন্নত। ঈদ আনন্দের দিন হলেও এটি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো উৎসব নয়। ঈদের চাঁদ দেখার সময় এই দোয়া পড়ার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং প্রার্থনা করে—যেন ঈদের আনন্দ গুনাহে পরিণত না হয়, বরং ইবাদত ও শোকরের মাধ্যমে তা বরকতময় হয়ে ওঠে।
অনেক আলেম আরও একটি দোয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন, যা নতুন চাঁদ দেখার সময় পড়া যায়। তা হলো: “হিলালু খাইরিন ওয়া রুশদ।” অর্থাৎ, এই চাঁদ কল্যাণ ও হেদায়েতের চাঁদ হোক। যদিও এটি আগের দোয়ার মতো প্রসিদ্ধ নয়, তবে অর্থের দিক থেকে এটি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চাঁদ দেখা নিয়ে ইসলামে বাস্তব দর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো।” এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, চাঁদ দেখা শুধু জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব নয়, বরং ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত একটি সুন্নত আমল।
আরও পড়ুনঃ নাজাতের ১০ দিন: জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া (আল্লাহুম্মা আজিরনা...)।
সবশেষে বলা যায়, রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখার দোয়া মুসলমানদের জীবনে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই দোয়াগুলোর মাধ্যমে বান্দা নতুন সময়কে আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দেয় এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে তাঁর সাহায্য কামনা করে।
তাই চাঁদ দেখার সময় এই দোয়াগুলো পড়া শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ইমান, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির এক সুন্দর প্রকাশ।
মন্তব্য করুন

